মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা ও ডিএনএ মেরামতের বিশেষ ক্ষমতাই কি দীর্ঘায়ুর রহস্য? জোনাথন নামের বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণীকে নিয়ে গবেষণায় মিলেছে এমনই চমকপ্রদ ইঙ্গিত।
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক পরিচিত স্থলচর প্রাণী জোনাথন। সেশেলসের অ্যালডাবরা জায়ান্ট কচ্ছপ প্রজাতির এই প্রাণীর বয়স আনুমানিক ১৯৪ বছর। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ব্রিটেন নিয়ন্ত্রিত সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বসবাসকারী এই কচ্ছপের জিনোম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য কিছু রহস্য উন্মোচন করেছেন। তাঁদের ধারণা, জোনাথনের শরীরে ডিএনএ মেরামতের বিশেষ ব্যবস্থা ও মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকর ভূমিকা বার্ধক্যের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জোনাথনের জিনোমের মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতাসংশ্লিষ্ট কিছু অংশ মাত্র পাঁচ বছর বয়সী একটি অ্যালডাবরা জায়ান্ট কচ্ছপের মতো কার্যকর। মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের শক্তি উৎপাদনকেন্দ্র বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে পর্যাপ্ত শক্তি পাওয়ার ফলে জোনাথনের শরীরের ডিএনএ মেরামতব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকতে পারে। এর ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ক্ষতি মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির কালেল ফাউন্ডেশনের গবেষক স্টিফেন ক্লার্ক ও তাঁর সহকর্মীরা এই গবেষণা পরিচালনা করেন। তাঁরা জোনাথনের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অন্য চারটি অ্যালডাবরা জায়ান্ট কচ্ছপের ডিএনএ তুলনা করেন। এতে জোনাথনের মধ্যে ২৮৭টি জিন শনাক্ত করা হয়, যেগুলোতে পাওয়া পরিবর্তনগুলো অন্য নমুনাগুলোর তুলনায় স্বতন্ত্র। এর মধ্যে ৪১টি জিনের পরিবর্তন জীববৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় এক ডজন জিনের সঙ্গে অন্যান্য দীর্ঘজীবী প্রাণীর বার্ধক্যবিষয়ক গবেষণায় পাওয়া জিনগত বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘায়ু মানুষের মধ্যেও একই ধরনের কিছু জিনগত প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে। স্পেনের জোসেপ ক্যারেরাস লিউকেমিয়া গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক মানেল এস্টেলার এর আগে ১১৭ বছর বয়সী এক নারীর ওপর গবেষণা করে মাইটোকন্ড্রিয়ার অসাধারণ কার্যকারিতার সন্ধান পেয়েছিলেন। জোনাথনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা তাঁদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেন্ট হেলেনা কর্তৃপক্ষ সংক্রমণের ঝুঁকি ও জোনাথনের বিশেষ মর্যাদার কথা বিবেচনা করে রক্তের নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেয়নি। ফলে গবেষকেরা তার লালা ও গালের কোষ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করেন। নমুনায় ব্যাকটেরিয়ার দূষণের আশঙ্কা থাকায় অন্য কচ্ছপের ডিএনএ ব্যবহার করে জোনাথনের জিনোমের কিছু অংশ পূরণ করতে হয়েছে।
জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কৌসুকে হাশিমোতো গবেষণাটিকে আকর্ষণীয় বললেও মাত্র চারটি কচ্ছপের সঙ্গে তুলনার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন।
গবেষকেরা মনে করছেন, জোনাথনের মতো ব্যতিক্রমী দীর্ঘজীবী প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বার্ধক্যের সাধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে এই আবিষ্কার মানুষের আয়ু বাড়ানোর সরাসরি কোনো পদ্ধতি নয়; বরং দীর্ঘায়ুর জৈবিক রহস্য অনুসন্ধানে এটি একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ।