হোম > পরিবেশ

দূষিত কালো পানির বুড়িগঙ্গায় কীভাবে টিকে আছে বিপন্ন শুশুক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে টিকে আছে ডলফিন। ছবি: মোঙ্গাবে

চরম শিল্পবর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনে বিষাক্ত হয়ে পড়া রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে এখনো অন্তত ২০টি বিপন্ন প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন বা ‘শুশুক’ টিকে রয়েছে। যেখানে বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেখানে পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যেও এই প্রাণীদের টিকে থাকার ঘটনা গবেষকদের বিস্মিত করেছে।

আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক গণমাধ্যম ‘মোঙ্গাবে’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মঙ্গোলীয় ও স্থানীয় গবেষকদের চালানো ১২ মাসের এই জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ‘জার্নাল অব এশিয়া-প্যাসিফিক বায়োডাইভারসিটি’-তেও এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ এবং গবেষক মো. আমিনুর রহমানের যৌথ পরিচালনায় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার ২৭ কিলোমিটার জুড়ে এই গবেষণা চালানো হয়।

১২ মাসের মধ্যে ১০ মাসই নদীতে শুশুকের উপস্থিতি দেখা গেছে। বিশেষ করে শীতকালে, ডিসেম্বর মাসে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর এবং ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে এদের দেখা পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় দেখা যায়, বুড়িগঙ্গায় শুশুকের গড় দলগত আকার ৪ দশমিক ১৮, যা আগের অনেক প্রতিবেদনের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেখা পাওয়া মোট শুশুকের প্রায় ১৬ শতাংশই বাচ্চা।

গবেষক মো. আমিনুর রহমান মোঙ্গাবে-কে বলেন, ‘বুড়িগঙ্গার পরিবেশ শুশুকের বসবাসের উপযোগী নয়, কারণ সেখানে দেশি মাছ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রথম যখন আমরা এদের দেখতে পাই, তখন বেশ অবাক হয়েছিলাম যে এই পানিতে মাছের বেঁচে থাকা যেখানে অসম্ভব, সেখানে এরা কীভাবে টিকে আছে!’

গবেষকদের মতে, বুড়িগঙ্গায় দেখতে পাওয়া অধিকাংশ শুশুক মূলত মোহাম্মদপুরের বসিলা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করে এবং কখনো কখনো ধলেশ্বরী হয়ে মেঘনা নদীতে যাতায়াত করে।

পরিবেশ সংস্থা ‘সি স্মার্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত পাঁচটি শহরের নদীর একটি হলো বুড়িগঙ্গা।

২০২৫ সালে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের ওপর প্রকাশিত অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, ট্যানারি, টেক্সটাইল ডাইং, ব্যাটারি কারখানা ও বিভিন্ন ধাতব শিল্পের অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে এসে পড়ে। পানির নমুনায় সিসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো মারাত্মক ভারী ধাতুর উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী।

তবে এই চরম দূষিত পরিবেশেও দক্ষিণ আমেরিকার দ্রুত প্রজননক্ষম প্রজাতি ‘সাকার মাছ’ বুড়িগঙ্গায় ব্যাপক হারে বংশবৃদ্ধি করেছে। এই মাছটি পানির বাইরে থেকে বাতাস থেকেও অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে এবং চরম দূষণ সহ্য করতে সক্ষম।

গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, ‘বুড়িগঙ্গার বর্তমান পরিবেশ অধিকাংশ মাছের উপযোগী নয়। তবে সাকার মাছে পুরো নদী ভরে গেছে। আমরা ধারণা করছি, শুশুকগুলো এখন খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে এই সাকার মাছ শিকার করেই বেঁচে আছে।’

বাংলাদেশে শুশুকের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস) বাংলাদেশের যৌথ সমীক্ষায় দেশের বিভিন্ন নদীতে ২ দশমিক ৩০৭টি গঙ্গা নদীজ ডলফিন রেকর্ড করা হয়েছে।

তবে অপরিকল্পিত শিল্পবর্জ্য, নদীতে অতিরিক্ত নৌযান চলাচল এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহার এই জলজ প্রাণীর অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। ২০১৩ সালে তুরাগ নদীতে শুশুক দেখা গেলেও বর্তমানে সেখানে আর তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই।

অধ্যাপক আজিজ জোর দিয়ে বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় যদি শুশুক রক্ষা করতে হয়, তবে প্রথম ও প্রধান কাজ হলো শিল্পবর্জ্য ফেলে পানি দূষণ বন্ধ করা। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল ও ক্ষতিকর জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে, না হলে এই বিরল জলজ প্রাণীগুলোকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।’