হোম > পরিবেশ

বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাড়ছে সমুদ্রের উচ্চতা, বিলীনের মুখে ক্যালিফোর্নিয়ার সৈকত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ক্যালিফোর্নিয়ার সেই উপকূলরেখা বদলে যাচ্ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে। ছবি: সংগৃহীত

ক্যালিফোর্নিয়ার মালিবুতে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরের কাছেই হলিউড তারকা নিকোলাস কেজের বাড়ি। সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় সমুদ্র তীরবর্তী বাড়িঘরগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঢেউয়ের তোড়ে একটি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। শহর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে আরও ১৬টি বাড়ি খালি করতে হয়েছে অথবা সেগুলোতে বসবাসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এ গ্রীষ্মে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পেছনে ছিল পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেন। এসব হারিকেন সরাসরি ক্যালিফোর্নিয়ায় আছড়ে পড়েনি। তবে সেগুলো এমন শক্তিশালী ঢেউ তৈরি করেছে, যা উপকূলে আছড়ে পড়ে সৈকত থেকে বালু সরিয়ে নিয়েছে। বদলে দিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সেই উপকূলরেখা, যা হলিউড বা সিলিকন ভ্যালির মতোই রাজ্যটির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এর প্রভাব আরও বাড়িয়েছে ‘এল নিনো’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক মাসে আরও ভয়াবহ ঢেউ আঘাত হানতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র হয়ে ওঠা প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্রের সঙ্গে যদি বছরের সর্বোচ্চ জোয়ারের সময় মিলে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা ক্রুজ ক্যাম্পাসের সেন্টার ফর কোস্টাল ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্সের গবেষণা পরিচালক প্যাট্রিক বার্নার্ড বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবকিছুর তীব্রতাই বেড়ে যাচ্ছে। এবারের শীতও বেশ ভয়াবহ হতে যাচ্ছে।

আরও বিপর্যয়ের আশঙ্কায় ক্যালিফোর্নিয়া চলতি সপ্তাহেই আগাম জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণ কার্যক্রম ও জরুরি সেবার কর্মীদের দ্রুত কাজে নামানো সহজ হবে। জুনে এল নিনোর প্রভাব শুরু হয়। বছরের শেষ পর্যন্ত এবং ২০২৭ সালের শুরুতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে সান্তা মনিকায় এ সপ্তাহের শেষে হতে যাওয়া প্রথম ‘ওশান ওয়ে ফেস্টিভ্যাল’ বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে হারিকেন মেরির কারণে উত্তাল সমুদ্র ও বৃষ্টির পানির প্রবাহে পিয়ারের ঠিক দক্ষিণে থাকা উৎসবের বড় অংশের জায়গা ক্ষয় হয়ে যায়। গতকাল শুক্রবার মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে ‘পোলো’ নামে একটি হারিকেন সক্রিয় ছিল। এটি উত্তরের দিকে আরও শক্তিশালী ঢেউ পাঠাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কয়েক বছর পরপর এল নিনো দেখা যায়। এ সময় মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উপরিভাগ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। এতে বায়ুমণ্ডলের চলাচল ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়। গত এক শতকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি বা ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। শক্তিশালী এল নিনোর সময় সাময়িকভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ আরও ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি বা ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার বেড়ে যেতে পারে।

এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্রের নিচের ‘কেলভিন ওয়েভ’ বা কেলভিন ঢেউও সাময়িকভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি বাড়িয়ে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সমুদ্রবিজ্ঞানী মাইকেল জ্যাকক্স বলেন, চলতি এল নিনোর প্রথম বড় কেলভিন ঢেউ অক্টোবরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছানোর কথা। এর প্রভাব আবার বছরের নির্দিষ্ট সময়ে হওয়া অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার বা ‘কিং টাইড’-এর সঙ্গে মিলে যেতে পারে। এই জোয়ারের তীব্রতা বাড়ে ১৮ দশমিক ৬ বছরের চন্দ্রচক্রের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে।

এল নিনোর কারণে ‘অ্যাটমসফেরিক রিভার’ নামে পরিচিত বিশাল বৃষ্টির প্রবাহও তৈরি হতে পারে। এসব বৃষ্টিতে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সৈকতের উঁচু পাড় বা ব্লাফও ক্ষয়ে যেতে পারে।

সাধারণত ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল বেশ খাড়া হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য নিচু উপকূলীয় এলাকার মতো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও সমুদ্রের পানি ঢুকে পড়ার সমস্যা এত দিন সেখানকার বাসিন্দাদের তেমন ভোগায়নি।

সান দিয়েগো শহর থেকে প্রায় ৩৫ মাইল বা ৫৬ কিলোমিটার উত্তরে ১ লাখ ১২ হাজার মানুষের শহর কার্লসবাড। শহরটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র টামারাক বিচের বালু প্রায় রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। হোটেল কক্ষের কর থেকে শহরটির পরিচালন বাজেটের ১৪ শতাংশ আসে। ফলে সৈকতের এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

টামারাক বিচে এখনো সার্ফাররা ভিড় করেন। তবে সাধারণ সময়ে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আনাগোনায় মুখর থাকা সৈকতটি এখন অনেকটাই ফাঁকা। সামান্য যে বালু অবশিষ্ট আছে, সেখানে জায়গা দখল করে বসে থাকছেন হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী।

সকালের সার্ফিং শেষে সেখানে থাকা সার্ফার অ্যালেক্স স্টট বলেন, আশা করা যায় কর্তৃপক্ষ কোনো সমাধান বের করতে পারবে। কারণ প্রকৃতি চাইলে খুব দ্রুত পুরো সৈকতটাই ফিরিয়ে নিতে পারে। এখন যা ঘটছে, তাতে সেটিই যেন চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে।

ইউসি সান দিয়েগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির উপকূলীয় ভূ-আকৃতিবিদ অ্যাডাম ইয়াং সম্প্রতি টামারাক বিচ পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, আগে যেখানে বালুময় সৈকত ছিল, এখন সেখানে তাঁকে পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। সৈকতের আরও দক্ষিণে সমুদ্র পুরো সৈকতটাই গিলে ফেলেছে। ঢেউ এখন সেই পার্কিং এলাকায় গিয়ে আছড়ে পড়ছে, যেখানে আগে দর্শনার্থীরা বালুর মাত্র কয়েক ধাপ দূরে গাড়ি রাখতেন।

ইয়াং আরও বলেন, রাজ্য ও স্থানীয় সরকার চাইলে বিভিন্নভাবে উপকূল রক্ষার চেষ্টা করতে পারে। বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা শক্তিশালী করা, সৈকতে নতুন করে বালু যোগ করা কিংবা পাথর দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বালিয়াড়ির মতো কাঠামো বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

তবে তাঁর মতে, সবার জন্য কার্যকর এমন একটি সমাধান নেই। তিনি বলেন, উপকূল ক্ষয় হাজার বছর ধরেই চলছে। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। আসল সমস্যা হলো, মানুষ উপকূল ও সৈকতের ওপর এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নানা স্থাপনা তৈরি করেছে। আর সেটিই সমস্যাকে আরও বড় করেছে।