হোম > পরিবেশ

পলিথিনের বিস্তার ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদারের নির্দেশ

বাসস, ঢাকা  

ছবি: সংগৃহীত

বাজারে ফের দেখা যাচ্ছে অপচনশীল নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকাতে দেশব্যাপী নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিস্তার ঠেকাতে উৎপাদনকারী অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করা এবং কাঁচাবাজারে পলিথিনের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া পানিতে ভেসে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের তলদেশ ও উপকূলে জমা হওয়ার কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের প্রবাল প্রাচীর। এ-সংকট নিরসনে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাবরিন সুলতানা বলেন, দেশব্যাপী নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা জোরদার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় এটি জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার পরেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে। মুদিদোকান, কাঁচাবাজার, মাছের আড়ত ও ফলের দোকানে পলিথিন ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও সংস্থাকে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র ফেলে দেওয়ায় মাটি ও পানির গুণাগুণ নষ্টের পাশাপাশি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া অতিক্ষুদ্র কণা মাছ এবং কৃষিজাত খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক রোগব্যাধি সৃষ্টি করছে। পলিথিন বন্ধে ব্যবসায়ী, ক্রেতা এবং সর্বস্তরের জনসাধারণের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা সংস্থাগুলো পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ করলে পরিবেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।

তিনি বলেন, পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল নদী, খাল, পুকুর ও মাটিতে জমে দূষণ সৃষ্টি করে। এগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হতে পারে, যা মাটি ও পানিতে দীর্ঘদিন থেকে যায়।

ড. তানভীর আরও বলেন, গরু, ছাগল, কচ্ছপ, মাছ ও সামুদ্রিক পাখি প্লাস্টিক খেতে পারে। এতে তাদের অপুষ্টি, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। বায়ুদূষণ ও জলবায়ুর ওপর এসবের প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক পোড়ানোর ধোঁয়ায় ক্ষতিকর গ্যাস ও কণা থাকতে পারে। এই ধোঁয়া শ্বাসনালিতে জ্বালা, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ক্ষুদ্র কণা ও কিছু রাসায়নিক পরিবেশে ছড়িয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পরিবেশদূষণ, নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা, মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়া এবং জলজ প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার ঠেকাতে এটি ব্যবহারের পরিবর্তে বিকল্প ব্যাগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। পলিথিন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরও জোরদার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পলিথিনের পরিবর্তে কাপড়, পাট বা বারবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করা প্রয়োজন। প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে নিরাপদ ও পরিষ্কার কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করা উচিত। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল বারবার ব্যবহার না করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

২০০২ সালের ১ মার্চ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার আইন করে সারা দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নাফ নদীর মোহনা ও টেকনাফ এবং আশপাশের দেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে বর্জ্য আসছে। মাছ ধরার নৌকা, জাহাজ ও সমুদ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক স্রোতে ভেসে দ্বীপে পৌঁছাচ্ছে। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও মাছ ধরতে ব্যবহারের প্লাস্টিকও সমুদ্র সৈকতে জমা হচ্ছে।

তারা বলেন, সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। সেখানে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য জমে থাকা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি। এসব বর্জ্য সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংকট নিরসনে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে সরকার। পর্যটন নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সমুদ্র সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বারবিকিউ পার্টি করা, কেয়া বনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা সামুদ্রিক প্রাণী কচ্ছপ, পাখি, প্রবাল, তারা মাছ ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এ ছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকের মতো মোটরচালিত যানবাহন পুরোপুরি নিষিদ্ধ। পলিথিন বহন এবং ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, শ্যাম্পু ও সাবানের ছোট প্যাকেট এবং ৫০০ মিলি ও ১ লিটারের পানির বোতল ব্যবহার নিষেধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্লাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা বলেন, দ্বীপসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে থাকা বোতল ও অনেক প্যাকেটের গায়ে মিলেছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানের লোগো ও বিদেশি ভাষার লেখা। সমুদ্রস্রোত ও বাতাসে ভেসেই এসব বর্জ্য প্রতিবেশী দেশগুলোর উপকূল থেকে সেন্ট মার্টিনে এসে জমা হচ্ছে বলে তারা ধারণা করছেন।

এ অবস্থায় দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আন্তসীমান্ত সামুদ্রিক দূষণ মোকাবিলাও জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।