যুক্তরাষ্ট্রে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের কল বা টারবাইনে ধাক্কা খেয়ে ৪০ বছরে প্রাণ গেছে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ বাদুড়ের। ১৯৮১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই বিশাল পরিমাণ বাদুড়ের মৃত্যু হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাদুড়ের মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে নিউজসায়েন্টিস্টের প্রতিবেদনে জানা গেছে। বর্তমানে বছরে ১৫ লাখের বেশি বাদুড় মারা যাচ্ছে।
তবে এই পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎসকে বন্যপ্রাণীর জন্য আরও নিরাপদ করা যায় কি না তা নিয়ে ভাবছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর ফোর্ট কলিন্স সায়েন্স সেন্টারের গবেষক চার্লস লাবুজেট্টা বলেন, এই তথ্য ভবিষ্যতে কার্যকর সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক গবেষণাকে এগিয়ে নিতে পারে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাদুড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মশা এবং এমন কিছু মথের মতো পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে তারা সহায়তা করে, যেগুলোর শূককীট ফসলের ক্ষতি করে। কিন্তু আবাসস্থল হারানো, রোগবালাই ও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক প্রজাতির বাদুড় ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে কিছু প্রজাতিকে বিপন্ন বা হুমকির মুখে থাকা প্রাণী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
কীটনাশকের ব্যবহার এবং আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণও বাদুড়ের অস্তিত্বের জন্য হুমকির। এ ছাড়া বন্য প্রাণী সুরক্ষাসংক্রান্ত বিধিবিধান মেনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালানোর সময় গবেষকেরা এর আগেও বিভিন্ন বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক মৃত বাদুড়ের সন্ধান পেয়েছেন। তবে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের পর্যবেক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করে না। আবার একেকটি স্থানে পর্যবেক্ষণের পদ্ধতিও একেক রকম।
ফোর্ট কলিন্স সায়েন্স সেন্টারের আরেক গবেষক বেথানি স্ট্র বলেন, এসব কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা কঠিন।
স্ট্র প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা জানি, বাদুড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষতি কমাতে কি টারবাইনের প্রকৌশলগত নকশা বা স্থাপনের স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব?’ তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু এত দিন প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব ছিল।
এবার স্ট্র, লাবুজেট্টা ও তাঁদের সহকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরসংলগ্ন ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাওয়া ৪৯৯টি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন। ১৯৮১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টারবাইনে কত বাদুড় মারা গেছে, তা অনুমান করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। তাঁরা ১০টি প্রজাতির ওপর বিশেষভাবে নজর দেন।
গবেষকেরা একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ব্যবহার করেন। এতে মৃত বাদুড় খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পদ্ধতিগত পার্থক্য, টারবাইনের আকার ও নকশা এবং আশপাশের পরিবেশ বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৮১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনে আনুমানিক ১ কোটি ৮৭ লাখ বাদুড় মারা গেছে। ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর মৃত্যুর সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, এ সময়ে আরও বেশি বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে।
প্রজাতিভেদে মৃত্যুর সংখ্যায়ও বড় পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হোয়ারি বাদুড় (লাসিউরাস সিনেরিয়াস)। এ প্রজাতির আনুমানিক ৬৭ লাখ বাদুড় মারা গেছে। এরপর রয়েছে ইস্টার্ন রেড বাদুড় (লাসিউরাস বোরিয়ালিস), যার মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫৮ লাখ। সিলভার-হেয়ারড বাদুড় (লাসিওনাইটেরিস নকটিভাগানস) মারা গেছে আনুমানিক ৩৪ লাখ। আর বিগ ব্রাউন বাদুড়ের (এপটেসিকাস ফাসকাস) মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।
গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর কাছাকাছি অবস্থিত বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং অপেক্ষাকৃত লম্বা ব্লেডযুক্ত টারবাইনে কয়েকটি প্রজাতির বাদুড়ের মৃত্যুর হার বেশি। অন্যদিকে, টারবাইনের ব্লেড ও ভূমির মধ্যে দূরত্ব বেশি রাখলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমতে পারে।
বাদুড় কেন টারবাইনের এত কাছাকাছি উড়ে যায়, তা নিয়ে গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন। আগের গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছিল, পরিযায়ী বাদুড় টারবাইনকে গাছ ভেবে ভুল করতে পারে। খাবার, আশ্রয় কিংবা সঙ্গী খুঁজতে গিয়ে তারা এসব কাঠামোর কাছে চলে আসে।
ইউরোপে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ বাদুড় কখনো কখনো টারবাইনের আশপাশে সঙ্গী আকর্ষণের জন্য বিশেষ ডাক বা গান করে। এতে স্ত্রী বাদুড়ও ঘূর্ণায়মান ব্লেডের গতিপথে চলে আসতে পারে। বিভিন্ন প্রজাতির বিস্তৃতি ও আচরণগত পার্থক্যও কিছু প্রজাতির বেশি ঝুঁকিতে পড়ার কারণ হতে পারে।
গবেষকেরা আশা করছেন, তাঁদের এই ফলাফল বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাতাদের বাদুড়ের সুরক্ষায় সহায়তা করবে। নিরাপদ স্থান নির্বাচন এবং টারবাইনের নকশায় পরিবর্তন এনে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে, টারবাইনের গায়ে ডোরাকাটা নকশা দিলে সামুদ্রিক পাখির সঙ্গে টারবাইনের সংঘর্ষ কমানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, টারবাইন চালুর সময় পরিবর্তন করেও বাদুড়ের মৃত্যু কমানো যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাদুড়ের সক্রিয়তা বেশি থাকার সময়ে, বিশেষ করে বাতাসের গতি কম থাকলে, সাময়িকভাবে টারবাইন বন্ধ রাখলে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও তুলনামূলকভাবে সামান্য কমে।