হোম > পরিবেশ

কোটি মানুষের খাদ্য জোগাতে পারে এই ‘মিথ্যা কলাগাছ’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইথিওপিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় এনসেট গাছের বাগান। ছবি: সিএনএন

বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থায় ধান, গম ও ভুট্টার আধিপত্য দীর্ঘদিনের। পৃথিবীর মানুষের মোট ক্যালরির অর্ধেকেরও বেশি আসে এই তিন ফসল থেকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিজ্ঞানীরা এখন এমন কিছু কম পরিচিত ফসলের দিকে নজর দিচ্ছেন, যেগুলো ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম ইথিওপিয়ার এনসেট (Enset)। এটিকে বলা হচ্ছে, ‘ক্ষুধাবিরোধী গাছ’ বা ‘স্টেরয়েড নেওয়া কলা’। আবার কেউ কেউ এটিকে ‘অলৌকিক ফসল’ বলে ডাকছেন।

কলাগাছের সঙ্গে দেখতে অনেকটা একই রকম হলেও এনসেট আসলে গাছ নয়, বিশাল আকৃতির এক ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ। এটি ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বুনো এনসেট আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে পাওয়া গেলেও খাদ্যশস্য হিসেবে এর চাষ শুধু ইথিওপিয়াতেই সীমাবদ্ধ। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় কৃষকেরা ব্যাপকভাবে এটি চাষ করেন।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ-এর সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী জেমস বোরেল এনসেট নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, উদ্ভিদটি অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম। খরা ও বিভিন্ন রোগ সহ্য করার ক্ষমতার পাশাপাশি এটি বহুবর্ষজীবী—অর্থাৎ প্রতিবছর নতুন করে জমিতে বপন করতে হয় না।

আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানায়, এনসেটের কাণ্ড ও মাটির নিচের কন্দ পিষে কয়েক মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত গাঁজন করা হয়। এরপর তা দিয়ে তৈরি হয় ইথিওপিয়ার জনপ্রিয় খাবার কোচো। প্রক্রিয়াজাত করার সময় পাওয়া স্টার্চসমৃদ্ধ তরল থেকে তৈরি করা হয় বুল্লা, যা দিয়ে পায়েস বা ডাম্পলিংজাতীয় খাবার তৈরি করা যায়।

তবে দেখতে কলার মতো হলেও এর ফল খাওয়ার উপযোগী নয়। হলুদ বা কমলা রঙের ফলের ভেতর সুস্বাদু শাঁসের বদলে থাকে শক্ত কালো বীজ। এ কারণেই এনসেটকে অনেক সময় বলা হয় ‘ফলস ব্যানানা’ বা মিথ্যা কলাও বলা হয়।

কলা ও এনসেট ফল। ছবি: সিএনএন

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬০টি এনসেট গাছ একটি পাঁচ সদস্যের পরিবারকে এক বছর পর্যন্ত খাদ্য জোগাতে পারে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় বোরেল ও তাঁর সহকর্মীরা দেখান, ইথিওপিয়ার বর্তমান চাষের এলাকা আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশে সাব-সাহারান আফ্রিকায় এনসেটের চাষ ছড়িয়ে দেওয়া গেলে অতিরিক্ত প্রায় ১১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের খাদ্য জোগানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রশ্ন হলো—এত সম্ভাবনাময় ফসল ইথিওপিয়ার বাইরে ছড়াল না কেন?

বোরেলের মতে, এর পেছনে রয়েছে সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ব্যবহারিক নানা কারণ। ইথিওপিয়া উদ্ভিদের জেনেটিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর নীতি অনুসরণ করে। উদ্ভিদসম্পদ বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। ফলে উন্নত ও খাদ্যোপযোগী এনসেটের জাত অন্য দেশে নেওয়া সহজ নয়।

আরেকটি সমস্যা হলো চাষ ও সংগ্রহের জটিলতা। এনসেট সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং এর বড় অংশ করেন নারী কৃষকেরা। পাশাপাশি গাছটি প্রক্রিয়াজাত করে খাবার বানাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বহু প্রজন্মের অর্জিত বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন। এনসেটের স্বাদও সবার কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ইথিওপিয়াতেই। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪০০-এর বেশি কৃষকের প্রায় ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তাঁদের জমিতে এনসেটের চাষ কমেছে। শহরায়ণ ও বাজারের চাহিদার কারণে অনেকে গম, ভুট্টা ও আলুর মতো বাণিজ্যিক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে গুটিকয়েক ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তাই এনসেটের মতো অবহেলিত ও কম ব্যবহৃত ফসল সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ খাদ্যব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে পারে।

বোরেলের ভাষায়, ইতিহাসের সামান্য ভিন্ন মোড় হলে হয়তো আজ ধান, গম বা ভুট্টার জায়গায় অন্য কোনো ফসল বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করত। এনসেট সেই সম্ভাবনাময় ‘অন্য ফসলগুলোর’ একটি—যার মূল্য হয়তো বিশ্ব এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।