ভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকরের আকস্মিক প্রয়াণে বিনোদন জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই গুণী অভিনেতা।
তাঁর মৃত্যুর পর চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র জগতের বহু সহকর্মী শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এর মধ্যে জনপ্রিয় তারকা আলোকচিত্রী অতুল কাসবেকরের একটি আবেগঘন স্মৃতিচারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে অতুল কাসবেকর নানা পাটেকরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, পুনের কাছে অভিনেতার খামারবাড়িতে কাটানো মুহূর্ত এবং নানা পাটেকরের অত্যুচ্চ ব্যক্তিত্ব ও অনন্য রসবোধের স্মৃতিকথা তুলে ধরেছেন।
নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে অতুল কাসবেকর লেখেন, ‘নানা সাহেব। কী অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন, আর কী অপূরণীয় ক্ষতি! তাঁর সঙ্গে আমার দারুণ উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। প্রায়ই দেখা হতো না, কিন্তু যখনই দেখা হতো মনে হতো যেন গতকালই সাক্ষাৎ হয়েছে।’
একজন মারাঠি হিসেবে আলোকচিত্র জগতে নিজের স্থান তৈরি করায় নানা পাটেকর তাঁকে নিয়ে গর্ব বোধ করতেন বলে জানান অতুল। তিনি বলেন, ‘তাঁর মুখে সব সময়ই উষ্ণ অভ্যর্থনা থাকত, এর সঙ্গে যোগ হতো তাঁর ট্রেডমার্ক কটু কিন্তু চমৎকার রসবোধ।’
নিজের চিত্রপ্রদর্শনী ‘অনেস্ট: পোর্ট্রেটস অব ক্যারেক্টার’-এর জন্য নানা পাটেকরের ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে অতুল লেখেন, ‘তিনি আনপ্রেডিকটেবল, তীব্রভাবে উপস্থিত ও অত্যন্ত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ছিলেন। নানা সাহেব কোনো কক্ষে সাধারণ মানুষের মতো প্রবেশ করতেন না, মনে হতো পুরো ঘরটার নিয়ন্ত্রণ তিনি একাই নিয়ে নিয়েছেন।’
ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অতুল জানান, শুটিংয়ের আগে নানা পাটেকরের প্রথম উদ্বেগ ছিল সেটের সবার খাবারের বন্দোবস্ত করা।
‘তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল কতজন লোক আসছে। ক্রু মেম্বারের সংখ্যা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন না, তাঁর চিন্তা ছিল সবাই যেন দুপুরের খাবার খায়। আর সে কী রাজকীয় ভোজ! সহকারী, স্পট বয় থেকে শুরু করে ড্রাইভার—সবাইকে তার মূল ডাইনিং টেবিলে বসানো হয়েছিল। নানা সাহেব নিজে হেঁটে হেঁটে অতিরিক্ত রুটি আর তার বিখ্যাত খাসির মাংস পরিবেশন করছিলেন।’ যোগ করেন অতুল।
অভিনেতার এই উদারতার প্রশংসা করে অতুল লেখেন, ‘কোনো সামাজিক অনুক্রম ছিল না, কোনো আড়ম্বর ছিল না। যে মানুষটি চোখের এক ভ্রু তুলে পুরো ফিল্ম সেটকে স্তব্ধ করে দিতে পারতেন, তার কাছ থেকে এই অসাধারণ উদারতা সত্যিই বিরল।’
স্মৃতিচারণে অতুল কাসবেকর নানা পাটেকরের শরীরচর্চা ও এক ব্যতিক্রমী রসবোধের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, কোনো ধরনের ওয়ার্ম-আপ ছাড়াই নানা পাটেকর কাসবেকরকে তাঁর জিমে এক ডজন ট্রাইসেপ ডিপস করে দেখান।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল যখন নানা পাটেকর তাঁকে নিজের সৎকারের জন্য জমিয়ে রাখা কাঠের স্তূপ দেখান।
অতুলের ভাষায়, ‘একটি বিষাদময় কিন্তু অসাধারণ রসাত্মক মুহূর্তে তিনি আমাকে নিজের সৎকারের জন্য প্রস্তুত করে রাখা শুকনা কাঠের স্তূপ দেখান। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, কাঠ ভিজা থাকলে ধোঁয়া হয়, আর তিনি চান না তাঁর সৎকার অনুষ্ঠানে এসে ধোঁয়ার কারণে মানুষ অঝোরে কাঁদুক! কেবল নানা সাহেবের পক্ষেই নিজের দাহ অনুষ্ঠানকে একটি কমেডি রুটিনে রূপ দেওয়া সম্ভব।’
নানা পাটেকরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অতুল লেখেন, ‘তিনি ছিলেন একজন সবকালে প্রাসঙ্গিক অভিনেতা, একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর এবং এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সেই ভয়াল বা ভীতিপ্রদ বাহ্যিক রূপের নিচে একজন অত্যন্ত উদার ও খাঁটি মানুষ বাস করতেন।’
তিনি আরও লেখেন, ‘তাঁর এই চলে যাওয়া ব্যক্তিগত ক্ষতের মতো মনে হচ্ছে। আমি যে তাঁর পোর্ট্রেট তুলতে পেরেছিলাম তার জন্য সম্মানিত, তবে তার চেয়েও বেশি কৃতজ্ঞ তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়, কথোপকথন ও হাসিমুখের স্মৃতিগুলোর জন্য। মালহার, নীলু জি এবং তাঁর সব প্রিয়জনের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।’
গতকাল ভোরে গোয়ার দোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়েন নানা পাটেকর। ভোর প্রায় সাড়ে ৪টায় তাঁকে অচেতন অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করলেও সকাল ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয় জগতে আত্মপ্রকাশ করা নানা পাটেকর ‘পারিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘অগ্নিসাক্ষী’র মতো চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালে তাঁকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করা হয়।