হোম > বিনোদন > বলিউড

বিদায় নানা পাটেকর (১৯৫১-২০২৬)

নিখাদ অভিনয়ই ছিল যাঁর অস্ত্র

বিনোদন ডেস্ক

নানা পাটেকর। ছবি: সংগৃহীত

না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা নানা পাটেকর। ৮ অক্টোবর ভোরে গোয়ায় নিজ বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বৃহস্পতিবার ভোরে বাড়িতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এই অভিনেতাকে। দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, টানা ৪৫ মিনিট দেওয়া হয় সিপিআর। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

প্রায় ৫০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা পাটেকর কখনোই স্রেফ একজন ‘তারকা’ হতে চাননি। আশির দশকে বলিউডে যখন সুদর্শন চেহারা আর গ্ল্যামারই ছিল নায়কের মূল মাপকাঠি, তখন তিনি এসে প্রচলিত সেই ব্যাকরণ ভেঙে দিয়েছিলেন। প্রখর মেধা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, পর্দায় রাজত্ব করতে নিখাদ অভিনয়ের চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই।

মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দা

১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায় জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার আসল নাম ছিল বিশ্বনাথ পাটেকর। মুম্বাইয়ের স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্ট থেকে পড়াশোনা শেষে প্রখ্যাত পরিচালক বিজয়া মেহতার হাত ধরে মঞ্চে তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্রে আসেন। এরপর বেশ কিছু মারাঠি সিনেমায় অভিনয় করেন। বলিউডে নজর কাড়েন ১৯৮৪ সালের ‘আজ কি আওয়াজ’ দিয়ে। এরপর ১৯৮৬ সালের ‘অঙ্কুশ’ সিনেমাটি তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

পার্শ্বচরিত্র থেকে নায়ক

১৯৮৯ সালের ‘পারিন্দা’ সিনেমায় আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের চরিত্রে অভিনয় করে পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার জেতেন নানা পাটেকর। তবে নিজেকে পার্শ্বচরিত্রের গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক এবং নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ‘তিরঙ্গা’ ও ‘ক্রান্তিবীর’ তাঁকে রীতিমতো সুপারস্টারে পরিণত করে। ক্রান্তিবীরে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতে প্রমাণ করেন, গ্ল্যামারাস হিরো না হয়েও শুধু অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকের হৃদয় জয় করা যায়।

খলচরিত্র ও কমেডিতেও অনবদ্য

‘আব তাক ছাপ্পান’, ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ কিংবা ‘রাজনীতি’র মতো সিনেমায় রাগী বা সিরিয়াস চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও সমান সাবলীল ছিলেন নানা পাটেকর। ‘ব্লাফমাস্টার’, ‘ফির হেরা ফেরি’ কিংবা ‘হ্যাটট্রিক’-এর মতো সিনেমায় তা বারবার প্রমাণ করেছেন। বিশেষ করে ‘ওয়েলকাম’ সিনেমায় ডন উদয় শেঠি চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় আজও দর্শকদের হাসির খোরাক জোগায়। এ ছাড়া মারাঠি সিনেমা ‘নটসম্রাট’ ও ‘ডা. প্রকাশ বাবা আমতে’-এ তাঁর কাজও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সেনাবাহিনী অধ্যায় ও সমাজসেবা

বাস্তব জীবনেও নানা পাটেকর ছিলেন অনন্য। ১৯৮৮ সালে টেরিটোরিয়াল আর্মিতে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে নিজের পরিচালিত ও অভিনীত সাড়া জাগানো সিনেমা ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’-এ মেজর চৌহানের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দীর্ঘ ও কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধে মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির হয়ে মেজর পদমর্যাদায় তিনি সরাসরি দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৩ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অবসর নেন। ওই বছর ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে।

মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের সহায়তায় ২০১৫ সালে তিনি গড়ে তোলেন নাম ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ান এবং তাঁদের সহায়তায় ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

ছিল কিছু বিতর্কও

নানা পাটেকরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বিতর্কের কালো ছায়াও কম পড়েনি। ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ সিনেমার সেটে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনেন। যদিও নানা পাটেকর সব সময় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পরে ২০১৯ সালে পুলিশ তাঁকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে সহ-শিল্পীদের সঙ্গে শুটিং সেটে পেশাদারত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

তবে এসব বিতর্ক নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারকে কখনোই পুরোপুরি ম্লান করতে পারেনি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন। নানা পাটেকর চলে গেলেন, রেখে গেলেন অবিস্মরণীয় কিছু কাজ। গ্ল্যামারের চাকচিক্য ছাড়া কেবল নিখাদ অভিনয় দিয়ে কীভাবে রুপালি পর্দা শাসন করা যায়, তিনি সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করে গেলেন।