সাক্ষাৎকার

শিল্পীর কোনো অবসর হয় না, বিদায় হয় না

কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। বাংলাদেশে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান শুরু হলে প্রথম তিন বছর পরপর সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনিসংকেত’ সিনেমায় অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয় করে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। এ বছর একুশে পদক উঠেছে তাঁর ঝুড়িতে। যে চলচ্চিত্রের সঙ্গেই কেটেছে সারাটা জীবন, সেই চলচ্চিত্র নিয়েই তাঁর রয়েছে মনঃকষ্ট। ববিতার সঙ্গে কথা বলেছেন এম এস রানা

জীবনে এত এত প্রাপ্তি। তবু কোন প্রাপ্তিটা আজীবন সেরা মনে হয়েছে?

মানুষের ভালোবাসা। একজন শিল্পীর জীবনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটা ঘটনা বলি, গাড়িতে করে যাচ্ছি, দেখি একটা মেয়ে ফুল বিক্রি করছে। আপা নেন, নেন, আপনার কত সিনেমা দেখছি—বলে একটা ফুল দিয়ে দিল। আমি বললাম, সিনেমা কী করে দেখলা? ও বলল, কেন, টেলিভিশনে। আপনার অভিনয় কত সুন্দর। আমি বললাম, মা, আমার কাছে তো এখন ভাংতি টাকা নাই, আরেক দিন নেব। ও বলল, না, না, আপনারে এই ফুল দিলাম, কোনো টাকা দিতে হবে না। আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল, আমি কানাডার ক্যালগারিতে যাব, খুব সুন্দর জায়গা। শিপে করে যাচ্ছি, সেখানে দেখি কয়েকজন বাঙালি নারী। কাছে এসে চিৎকার করে জড়ায়ে ধরল, পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আমি বললাম বাব্বা, কানাডার মানুষ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে! খুব ভালো লাগল। মানুষের এই যে এত ভালোবাসা। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?

এ বছর একুশে পদক পেলেন। এ নিয়ে আপনার একান্ত কোনো অনুভূতি?

জীবনে আমি যেমন দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছি, তেমনি প্রচুর পুরস্কার পেয়েছি, দেশি, বিদেশি। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে একুশে পদক। এই পদক পেয়ে আমি যে কী খুশি, তা বলে বোঝাতে পারব না। এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। আর, যেহেতু শ্রদ্ধেয় জহির ভাই (জহির রায়হান) আমাকে চলচ্চিত্র জগতে এনেছিলেন, তাই এটা ওনাকে উৎসর্গ করলাম।

আপনার মতো একজন কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পী, নিশ্চয়ই আশা করেছিলেন আরও আগেই হয়তো আপনার হাতে এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্মান উঠবে...

এটা নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না।

প্রত্যাশা নিশ্চয়ই ছিল?

হ্যাঁ, একটু তো মন চেয়েছিলই। মনে হতো, আমি কেন পাচ্ছি না, অনেকেই তো পাচ্ছেন। যাই হোক, এত দিন পাইনি, এখন পেলাম।

আপনার জীবনে বিএফডিসি গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা। জীবনের লম্বা সময় কাটিয়েছেন সেখানে। এখন কি সেখানে যাওয়া হয় আপনার?

সেই ১৩ বছর বয়স থেকে, যখন আমার খেলাধুলা করার বয়স, তখন থেকেই আমি এফডিসিতে ইন করেছি। প্রায় ৩০০ সিনেমা করেছি। ওই সিনেমাগুলো করতে গিয়ে আমার রেগুলার যেতে হয়েছে সেখানে। সকাল, বিকেল, দুপুর—এমনকি রাতের বেলাও, তিন শিফট করেও কাজ করেছি। এখন যেটা হয়েছে, আমার গাড়িটা যদি এফডিসির পাশ দিয়ে যায়, একবার তাকাই—এফডিসি! কিন্তু আমার আর ভালো লাগে না। মনটা কেমন যেন কেঁদে ওঠে। এফডিসিটা কেমন হয়ে গেছে। ফ্লোরগুলো আগের মতো নাই। কোনো কোনো ফ্লোর ভেঙে ফেলা হয়েছে। আগের মতো আর সিনেমার শুটিং হয় না। এখন বোধ হয় বিজ্ঞাপনের শুটিং হয় বেশি। সেই আগের পরিচালকেরা নাই। একজন জহির রায়হান নাই, একজন খান আতা, একজন আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ মিতা নাই। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবতী যে এ রকম বড় বড় পরিচালকের সিনেমা করেছি।

এফডিসির উন্নয়নের জন্য তো নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে...

শুনি তো। এটা অনেক দিন ধরেই শুনে আসছি। কিন্তু কী হচ্ছে? এখন তো আমার মনে হয়, ভেতরে সবকিছু ফাঁকা। কিছুই নাই।

কিন্তু আপনার মতো কিংবদন্তি শিল্পী যাঁরা, যদিও এখন অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। তবু যাঁরা আছেন, আপনাদের কি পরামর্শের জন্য ডাকে কর্তৃপক্ষ? কী করলে চলচ্চিত্রের ভালো হবে, এফডিসির উন্নয়নে কী করা উচিত—এসব জানতে চায়?

না, এখন ডাকে না। কারা ডাকবে? এফডিসির এমডি যিনি, তাঁর জ্ঞান থাকতে হবে ফিল্ম সম্পর্কে। ফিল্ম সম্পর্কে জ্ঞান না থাকাতে যেটা হয়, উনি তো অত বুঝবেন না। উনি হয়তো বিরাট সেক্রেটারি ছিলেন, উচ্চপদস্থ ছিলেন, কিন্তু চলচ্চিত্র সম্পর্কে তো তাঁকে জানতে হবে। তখনই না উনি এসব বিষয়ে নানা ধরনের ডিসিশন নিতে পারবেন। এসব অনেক কথা। বলে শেষ করা যাবে না।

বলছিলেন অবসরে প্রচুর সিনেমা দেখেন, পুরোনো দিনের সিনেমা। এখন যেসব সিনেমা হয়, সেগুলো দেখেন না?

আমি ইদানীংকালের সিনেমা দেখি না। দু-একটা যা-ও টেলিভিশনে একটু-আধটু দেখি, অবাক লাগে। আমাদের সিনেমাগুলো কী হতো? মা-বোনেরা হলে যেত। একটা সিনেমা চলছে তো চলছে, মাসের পর মাস যায় ও আর হল থেকে নামছে না। অর্থনৈতিকভাবেও ভালো করেছে, পুরস্কৃত হচ্ছে, প্রশংসিত হচ্ছে। এখন ঈদে বোধ হয় দু-একটা সিনেমা ভালো চলছে, তারপরে তো নাই। সে জন্য অনেক হলও ভেঙে ফেলা হয়েছে।

অনেক দেশে দেখা যায় আপনাদের মতো শিল্পী যাঁরা আছেন, যাঁদের বয়স হয়েছে, অভিজ্ঞজন, তাঁদের কেন্দ্র করেই গল্প, চিত্রনাট্য রচনা হয়, সিনেমা তৈরি হয়। আমাদের দেশে কেন হয় না? আপনার কী অভিজ্ঞতা?

এটা আশা করা যায় না। এটা হবে না। পাশের দেশে দেখেন, একজন অমিতাভ বচ্চন, একজন রেখা, একজন রাখী—এদেরকে বেজ করে গল্প তৈরি হয়। আমাদের তো তা হয় না। কিছুদিন আগে একজন এসেছিল। আমি বলেছি গল্পটা কী একটু বলেন? গল্প শুনে মনে হলো, আমাকে ঘিরে তো নয়ই, চ্যালেঞ্জিং রোল নেই, অভিনয়ের সুযোগও নেই। তা না থাকলে আমি কেন অভিনয় করব? সারা জীবন যা অর্জন করেছি, সেটা কেন নষ্ট করব? তার চেয়ে ভালো দূরে বসে থাকি।

কিন্তু শিল্পীদের তো কাজের তৃষ্ণাটা সব সময়ই থাকে...

থাকে, সেটা আমারও আছে। আমি তো বলিনি যে কাজ করব না। আমি কাজ যে করব, সে রকম গল্প তো আসতে হবে আমার কাছে। আমি তো বলিনি যে আমি বিদায় নিয়েছি। কেন বিদায় নেব? শিল্পীর কোনো অবসর হয় না, বিদায় হয় না।

চলচ্চিত্র যখন আপনাকে এতটা দিয়েছে, সেই চলচ্চিত্র অঙ্গনের দুরবস্থা দেখে আপনার কি কখনো মনে হয়, যদ্দুর পারি চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ করি, ভালো সিনেমা প্রডিউস করি...

আমি কিন্তু প্রডিউস করেছিলাম। আমার ববিতা মুভিজ থেকে ছয়-সাতটা সিনেমা প্রডিউস করেছিলাম এবং শেষ যে সিনেমাটি করেছিলাম, আখতারুজ্জামান সাহেব বানিয়েছিলেন ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’। ওইটা কিন্তু একদম চলেনি। বরং এত লস হয়েছে যে ওটার পর আমার ববিতা মুভিজ বন্ধ করে দিতে হলো। এখন আপনি ভালো সিনেমা বানাবেন, দর্শক হলে যাবে না। আপনাকে বানাতে হবে কমার্শিয়াল—নাচ, গান, হইহুল্লোড়, ফাইট এইসব পছন্দ করে।

সেটা তো আপনাদের সময়ও ছিল।

আমাদের সময়ও ছিল। আমাদের গানগুলো শ্রুতিমধুর ছিল! আমাদের গান, নাচ কী পরিমাণ ভালো ছিল! আমরা তো কোনো অশ্লীল পোশাক পরিনি। মডার্ন সিনেমা করেছি, মডার্ন ড্রেস পরেছি। এখন যেসব করা হয়, যেসব পোশাক পরা হয়, ছি... মা-বোনদের নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়া যায়?

অভিনেত্রী ববিতা হিসেবে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে আপনি কেমন দেখতে চান?

খুব সুন্দর একটা ইন্ডাস্ট্রি দেখতে চাই। আজকে দুঃখ করে বলতে হয়, জহির রায়হান সাহেব যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে চলচ্চিত্র জগৎটা অন্য রকম হতো। এখন সে রকম ভালো চাইলেই কি আর হবে? কে পরিচালনা করবেন? কে প্রযোজনা করবেন? তখন তো পরিচালককে প্রযোজক বলতেন, আপনি ভালো সিনেমা বানান, আমার ঘরে পয়সা আসুক বা না আসুক। এমন সিনেমা বানান যা দেখে দর্শক প্রশংসা করবে, হাততালি দেবে। এখন সে রকম প্রযোজক কই?

তাহলে উত্তরণের উপায়?

অভিজ্ঞজনদের সঙ্গে নিয়ে নতুনদের হাল ধরতে হবে নতুন করে, সবাই মিলে একটা সুন্দর ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের টিভি আয়োজন

প্রতিবাদ জানিয়ে পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেন তিউনিসিয়ান নির্মাতা

ঈদে ১৬ সিনেমা মুক্তি দিতে চান নির্মাতারা

ঈদের নাটক ‘হ্যাপি ডিভোর্স’

মুক্তি পাবে যেসব সিনেমা ও সিরিজ

গান গাইতে সব সময় ভয়ে থাকি—মানুষ ট্রল না করে দেয়

আরমীন মুসার প্রযোজনায় ‘বাংলা বাউল ফোক ভোকাল’

রমজান মাসজুড়ে সাফা কবিরের রান্নার অনুষ্ঠান

এত দিনে চিত্রনাট্যকার হিসেবে সম্মাননা পেলেন জেমস ক্যামেরন

মুক্তির অপেক্ষায় সায়রার দুই সিনেমা