হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড: প্রথমবার ১ স্বর্ণসহ ১৫ পদক জয়

ক্যাম্পাস ডেস্ক 

স্বপ্ন ছিল স্বর্ণপদকের। সেই স্বপ্ন এবার সত্যি হলো। আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে (আইএমএসও) দ্বিতীয়বার অংশ নিয়েই প্রথম স্বর্ণপদক জিতেছে বাংলাদেশ। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় অনুষ্ঠিত ২৩তম আসরে দেশের ১৬ খুদে প্রতিযোগীর ১৫ জনই পদক জিতেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্জন ১টি স্বর্ণ, ৭টি রৌপ্য ও ৭টি ব্রোঞ্জ পদক।

অনূর্ধ্ব-১৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ২৩টি দেশের চার শতাধিক প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশের খুদে শিক্ষার্থীরা অনন্য সাফল্য দেখিয়েছে।

বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম স্বর্ণ

আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদকটি এসেছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসানের হাত ধরে। অলিম্পিয়াডের বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক অংশে সেরা হয়ে সে অর্জন করেছে এই গৌরব। সব দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে তার স্কোর পঞ্চম সর্বোচ্চ।

তাহমিদ বলে, ‘স্বর্ণপদক পাওয়ার ইচ্ছা নিয়েই এসেছিলাম। তাত্ত্বিক-২-তে কয়েকটি সাধারণ ভুল করে একটু দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু ব্যবহারিক সেটা পুষিয়ে দিয়েছে। সোনার পদক পেয়ে খুবই ভালো লাগছে।’

এই সাফল্যই শেষ কথা নয় তাহমিদের কাছে। ভবিষ্যতে গণিতে আরও ভালো করতে চায় সে। স্বপ্ন বিশ্বের সেরা দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতে পড়ার। পরীক্ষা, ঘোরাঘুরি আর খাবারের বিচিত্র অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার দিনগুলোও তার স্মৃতিতে হয়ে থাকবে বিশেষ এক অধ্যায়।

বিজ্ঞানে আরও ছয় পদক

স্বর্ণপদকের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগে বাংলাদেশ পেয়েছে চারটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ পদক। পদকজয়ী ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন। বিজ্ঞান বিভাগে রৌপ্যপদক পেয়েছে অভিজ্ঞান রায় গল্প, মোহাম্মদ মুশরিফ আলম, রাইয়ান আফরাদ ও আরহাম আবিদ। ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে রাফসান শফিক তালুকদার ও সাহাবী ইবনে কাব্য।

দলের কনিষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী মুশরিফ ও রাইয়ান। বয়সে ছোট হলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের অর্জন কম নয়। সামান্য ব্যবধানের আক্ষেপও রয়েছে দলের। আরেক শিক্ষার্থী মো. মিফতাহুল ইসলাম মাত্র ১.২৫ নম্বরের জন্য ব্রোঞ্জ পদক থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

গণিতে আটজনই পদকজয়ী

গণিত বিভাগেও বাংলাদেশের সাফল্য শতভাগ। অংশ নেওয়া আট প্রতিযোগীর প্রত্যেকেই পদক জিতেছে। তাদের অর্জন তিনটি রৌপ্য ও পাঁচটি ব্রোঞ্জ পদক। বাংলাদেশ গণিত দলের সর্বোচ্চ স্কোর করেছে অরিজিৎ সাহা। রৌপ্যপদক জিতলেও স্বর্ণপদক থেকে ছিটকে গেছে অল্প কয়েক নম্বরের ব্যবধানে। দলের অন্য দুই রৌপ্যপদকজয়ী ইহান আবরাদ রহমান ও মো. সামিন সাইফ। ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে মো. নাবি হোসেন, আলী ওমর, শারাফ বিন আনোয়ার, মো. শাহিদ মোরসালিন ও ইরতিশ জায়েদ লিয়াম। গণিত দলের আট সদস্যই ঢাকার সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী।

অরিজিত বলে, ‘এবার আমার প্রস্তুতি বেশ ভালো ছিল এবং সোনার পদকের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সংক্ষিপ্ত ও রচনামূলক দুটোর কোনোটি প্রত্যাশামতো হয়নি, যদিও এক্সপ্লোরেশন বেশ ভালো হয়েছিল।’

তাহমিদের মতো অরিজিতেরও আইএমএসওতে এটাই শেষ অংশ গ্রহণ। তবে তার সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় লক্ষ্য। এখন থেকে আন্তর্জাতিক জুনিয়র বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড (আইজেএসও) ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের (আইএমও) জন্য প্রস্তুতি নিতে চায় সে। ভবিষ্যতে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর পড়াশোনার স্বপ্নও দেখছে এই খুদে প্রতিযোগী।

এক বছরের ব্যবধানে বড় অগ্রগতি

বাংলাদেশের আইএমএসওয়ের যাত্রা শুরু গত বছর। মালয়েশিয়ার কেদাহে অনুষ্ঠিত ২২তম আসরে প্রথমবার অংশ নিয়ে দেশের ১২ প্রতিযোগীর সবাই পদক জিতেছিল। সেবার অর্জন ছিল দুটি রৌপ্য ও ১০টি ব্রোঞ্জ পদক। এবার প্রতিযোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬। পদকজয়ীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক। পাশাপাশি রৌপ্যপদকের সংখ্যাও দুই থেকে বেড়ে হয়েছে সাত।

দলনেতা তানভীরুল ইসলাম, বিজ্ঞানের প্রশিক্ষক মীম নাজ রহমান এবং গণিতের প্রশিক্ষক সামিরা সুমাইয়া শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যে অভিনন্দন জানান।

বিজ্ঞানের প্রশিক্ষক মীম নাজ রহমান বলেন, প্রথমবার অংশ নিয়ে গত বছর রৌপ্যপদক পাওয়াটাই ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। তাই এবার লক্ষ্য ছিল স্বর্ণপদক। সে লক্ষ্য সামনে রেখে গত বছরের শেষ দিক থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রতিযোগীদের একাগ্রতা, অভিভাবকদের পরিশ্রম আর মেন্টরদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার সমন্বয়েই এই সাফল্য। আগামী বছর আমরা আরও ভালো ফল করতে চাই।’

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার ২৩তম আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে ২ থেকে ৭ অক্টোবর, ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায়। এই সাফল্যের পর বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নিজ দেশেও এমন আয়োজন করার স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।