কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি কমবেশি অনেকের পড়া। শিক্ষক যে শিক্ষার্থীদের পরম শ্রদ্ধেয়জন, কবি এই কবিতায় তা স্পষ্ট করেছেন। পিতা-মাতার পরই শিক্ষকের অবস্থান। একটি জীবন সুশৃঙ্খল ও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পরিবারের পর শিক্ষকেরাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন। প্রতিবছরের ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। দিবসকে কেন্দ্র করে কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী লিখেছেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে। তাঁদের স্মৃতিতে প্রিয় শিক্ষকদের কথা তুলে ধরেছেন নুসরাত জাহান অর্পিতা।
জীবনে কিছু মানুষের অবদান অনন্য। শিক্ষক তাঁদের মধ্যে অন্যতম। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পড়ান না, চিন্তা করতে শেখান, স্বপ্ন দেখান এবং কঠিন সময়ে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সাহস দেন। আমার প্রিয় শিক্ষক আব্দুস সামাদ স্যার তেমনই একজন।
স্যারের কাছ থেকে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, যুক্তি দিয়ে ভাবতে হয় এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়, তা শিখেছি। ভুল করলে তিনি শুধরে দিতেন। হতাশ হলে সাহস জোগাতেন। তাঁর ছোট্ট একটি উৎসাহেই ফিরে আসত আত্মবিশ্বাস।
স্যারের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা নিজের চিন্তা ও সামর্থ্যকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করেছে। তাঁর পরামর্শ কঠিন সময়ে পথ খুঁজতে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে। শিক্ষক দিবসে স্যারের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
উর্মি আক্তার ঝিনুক, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
অনেক শিক্ষকের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়। তবে অল্প কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেন। স্বর্ণা ম্যাম আমার কাছে তেমনই একজন। তাঁর আন্তরিকতা, স্নেহ, সুন্দর ব্যবহার এবং প্রতিটি কথার অনুপ্রেরণা আজও মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। ম্যামের কাছ থেকে শুধু বইয়ের পড়া নয়, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও শিখেছি। কখনো তাঁর একটি পরামর্শ, কখনো একটি উৎসাহের কথা কিংবা ছোট্ট একটি প্রশংসা কঠিন সময়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে। একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা শিক্ষার্থীর জীবনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা ম্যামের কাছ থেকেই উপলব্ধি করেছি। ম্যামের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
মাসুদ রানা, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়
একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অনেক শিক্ষকই অবদান রাখেন। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন প্রেরণার উৎস, পথচলার সাহস এবং প্রিয় শিক্ষক। আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন। তবে আমার শিক্ষাজীবনের পথচলায় তিনি একজন দিশারির ভূমিকা পালন করেছেন। আমার ডাক্তার হওয়ার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। যে বিষয়টির নাম শুনলেই একসময় ভয় পেতাম, তাঁর অনুপ্রেরণা, যত্ন ও সঠিক দিকনির্দেশনায় সেই বিষয়টিই একসময় আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি শুধু পড়াশোনায় উৎসাহ দেননি, বারবার বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন, চেষ্টা থাকলে আমিও পারব। শিক্ষক দিবসে তাই আমার প্রিয় শিক্ষককে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
সুরাইয়া ফেরদৌস ঋতু, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ
কলেজজীবনে এমন একজন শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, যাঁর ক্লাসে প্রবেশ করলেই যেন পুরো পরিবেশ বদলে যেত। তিনি আমার প্রিয় শিক্ষক রোকন স্যার। তাঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি ও আন্তরিক আচরণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করত। বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখা শিক্ষার্থীদের তিনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিতেন। সিলেবাসের কঠিন ও ভয়ের বিষয়গুলোও তিনি এত সহজ ও আনন্দময়ভাবে উপস্থাপন করতেন যে সেগুলো ধীরে ধীরে সহজ ও আগ্রহের হয়ে উঠত। তাঁর ক্লাসে শুধু বইয়ের পড়া নয়, শেখার প্রতি আগ্রহ এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার শিক্ষাও পাওয়া যেত। স্যারের দেওয়া পরামর্শগুলো আজও কঠিন সময়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। স্যারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা সব সময় থাকবে।
উম্মে হাবিবা, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
আমার হাইস্কুলের প্রিয় শিক্ষক রুবেল রায় স্যার। আজও মনে পড়ে, একদিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিলাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো পারব না। তখন স্যার খুব সহজভাবে বলেছিলেন, ‘চেষ্টা করতে থাকো, তুমি পারবে।’ কথাটি হয়তো স্যারের কাছে সাধারণ ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেটিই হয়ে উঠেছিল অসাধারণ এক সাহস। সেই কথাই আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছিল। আজ মহান শিক্ষক দিবসে আপনার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
আশরাফুল ইসলাম (নিপার), শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
আমার প্রিয় শিক্ষক মনছুরুল আলম এরশাদ। করোনাকালে টিনের চালার একটি ঘরে স্যারের কাছে পড়েছি। তখন বুঝেছিলাম, তিনি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র শেখান না, শেখান কীভাবে ভাবতে হয়, নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। কঠোর শাসনের আড়ালে ছিল গভীর স্নেহ। তাঁর মুখের কঠিন কথাগুলো তখন হয়তো ভয় তৈরি করত। কিন্তু আজ বুঝি, সেই কঠোরতাই ছিল আত্মগঠনের পাঠ। স্যারের ক্লাস ছিল আত্মবিশ্বাস তৈরিরও জায়গা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে যে ভয় একসময় আমাকে কাঁপিয়ে দিত, স্যারের দেখানো অনুশীলনেই তা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছি। উচ্চ মাধ্যমিকের পর স্যারের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না। তবু স্যারের শাসন, স্নেহ ও স্মৃতি আজও গভীরভাবে অনুভব করি। শিক্ষক যখন পেশাকে দায়িত্বের চেয়ে বড় করে একটি মিশনে পরিণত করেন, তখন তিনি শুধু পাঠদান করেন না, নীরবে মানুষ নির্মাণ করেন। মনছুরুল স্যার সেই নির্মাতাদেরই একজন।
মুহিবুল হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ