মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতক করছেন সুয়াইবুর রহমান। এর আগে তিনি বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কামিল সম্পন্ন করেন। মিসরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বৃত্তি, পড়াশোনার খরচ ও শিক্ষার্থীদের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাদিম মজিদ।
মিসরকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো এখানকার শিক্ষা ও ইসলামি জ্ঞানের দীর্ঘ ঐতিহ্য। বিশেষ করে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে ইসলামি ও আরবি শিক্ষার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব পরিবেশে আরবি ভাষা শেখা এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইসলামি জ্ঞান, আরবি ভাষা ও আন্তর্জাতিক পরিবেশে পড়তে আগ্রহীদের জন্য মিসর গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে পড়াশোনার মাধ্যম এবং খরচ আলাদা হয়। ইসলামি ও আরবি বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আরবি ভাষার ব্যবহার বেশি। অন্য অনেক বিষয়ে ইংরেজিও পড়াশোনা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় এবং শিক্ষার্থীর স্ট্যাটাস অনুযায়ী খরচের পার্থক্য রয়েছে। আল-আজহারে নিজ খরচে পড়া শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও অন্য ব্যয় নিজেদেরই বহন করতে হয়। তবে আরবি ও ইসলামি শিক্ষা বিষয়ে টিউশন ফি খুবই কম। আবার বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সকল খরচ ইউনিভার্সিটি বহন করে, আর খুবই সামান্য পরিমাণের একটি মাসিক স্টাইপেন্ড দেয়।
অন্যদিকে, আইন শামস বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি সেমিস্টারে টিউশন ফি ৭ থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৬ হাজার মার্কিন ডলার দেওয়া হয়।
এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার খরচ নির্ভর করে তিনি কীভাবে জীবনযাপন করবেন, তার ওপর। কোথায় বাস করছে, একা নাকি শেয়ার করে থাকছে, খাবারের ধরন কেমন এসবের কারণে খরচের পার্থক্য হয়। তবে মিসরের বিভিন্ন খাবার বিশেষ করে ফল খুবই সস্তা। বাসাভাড়া কিছুটা বেশি হলেও একসঙ্গে কয়েকজন থাকলে সেটা নাগালের ভেতরেই থাকে।
আল-আজহারে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। বৃত্তি পেলে টিউশন ফি মওকুফ, আবাসন সুবিধা এবং মাসিক আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়। বু ‘উস সিটিতে থাকা বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাসে ১ হাজার ৫০০ মিসরীয় পাউন্ড এবং সিটির বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড দেওয়া হয়।
সাধারণত জুন মাসে বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় এবং জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত আবেদন চলে। শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাস থেকে। তবে প্রতিবছর বৃত্তির সংখ্যা, শর্ত ও আবেদনপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হতে পারে। তাই আবেদনকারীদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বছরের অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা উচিত। আল-আজহারের বিদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য আবেদন করার আলাদা অনলাইন ব্যবস্থাও রয়েছে।
অনেক বিষয়েই পড়ার সুযোগ রয়েছে। আল-আজহারে ইসলামি শিক্ষা ও আরবি ভাষার বিভিন্ন বিষয় যেমন: উসূলুদ্দীন, শরিয়াহ, হাদিস, তাফসির, আরবি ভাষা, ইসলামি ও আরবি স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি আল-আজহারে মেডিকেল, ফার্মেসি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, কৃষিসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক বিষয়েও পড়াশোনা করা যায়।
প্রথমেই ভাষার প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষ করে আল-আজহারে পড়তে চাইলে আরবি ভাষায় ভালো দখল থাকতে হবে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কোন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোন বিষয়ে ভর্তি হতে পারবেন, তা আগেই জেনে নিতে হবে। পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ, সনদের সত্যায়ন, সমমান নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাকভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের দেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে থাকতে হবে। তাই নতুন পরিবেশ, খাবার, মানুষের জীবনযাপন—এসবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে।
বাংলাদেশে আমি হাদিস বিভাগ থেকে কামিল সম্পন্ন করেছি। তবে আমার ইচ্ছা ছিল আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানকে এমন একটি পরিবেশে আরও গভীরভাবে শেখা, যেখানে আরবি ভাষা ও ইসলামি শিক্ষার নিজস্ব একটা ঐতিহ্য রয়েছে। আল-আজহারে এসে আমি সেই সুযোগ পেয়েছি। এখানে আরবি ভাষা শুধু বইয়ের মধ্যে নয়, বাস্তবজীবনেও ব্যবহার করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আল-আজহারের শিক্ষাপদ্ধতিতে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছি। তাই এটিকে নিজের জ্ঞানকে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখি।
আমার অভিজ্ঞতায়, শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তাঁর সনদের গ্রহণযোগ্যতাই এখানে মূল বিবেচ্য। কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পড়েছে, শুধু সেটির ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় না। সনদটি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী সনদের গ্রহণযোগ্যতা ও সমমান যাচাই করা হয়। আল-আজহারের ক্ষেত্রেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত সনদ ও যোগ্যতা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা হয়। তাই মাদ্রাসাশিক্ষার ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই, যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়।
মিসরে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ সীমিত। কিছু ক্ষেত্রে কাজ পাওয়া গেলেও সম্মানী পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশিদের জন্য গার্মেন্টস খাতে কাজের সুযোগ রয়েছে, তবে পড়াশোনার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সেখানে কাজ করা সম্ভব নয়।
সুযোগ আছে, তবে সেটি ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর নির্ভর করে। আরবি ভাষা, শিক্ষা, গবেষণা, অনুবাদ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষামূলক কাজে দক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে চাইলে কাজের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় আইনি শর্ত পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে আমরা মূলত ফুসহা বা প্রমিত আরবি শিখি। কিন্তু মিসরের মানুষ দৈনন্দিন কথাবার্তায় মিসরীয় আরবি বা ‘মাসরি’ ব্যবহার করে। ফলে আরবি পড়তে ও বুঝতে পারলেও শুরুতে স্থানীয়দের স্বাভাবিক কথাবার্তা বুঝতে সমস্যা হতো। এটি আমার জন্য প্রথম দিকে বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল।
এরপর নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও ছিল। খাবার, মানুষের সঙ্গে চলাফেরা, জীবনযাপনের ধরন সবকিছুই নতুন। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এখন অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছি। বরং এখন মনে হয়, এই অভিজ্ঞতাগুলোও আমার শিক্ষাজীবনেরই একটা অংশ।
বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ কায়রো ও নাসের সিটিতে থাকেন। এর পাশাপাশি আলেকজান্দ্রিয়াসহ মিসরের অন্য শহরেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী রয়েছেন।
প্রথমত, শুধু অন্যের কথা শুনে মিসরে আসা উচিত নয়। কেন আসছেন, কী পড়বেন, কোথায় পড়বেন এবং খরচ কীভাবে চালাবেন, তা আগে পরিষ্কার করে নিন।
দ্বিতীয়ত, আরবি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে আল-আজহারে পড়তে চাইলে ফুসহা আরবির পাশাপাশি মিসরীয় কথ্য আরবি বুঝতে পারলে দৈনন্দিন জীবন সহজ হয়ে যায়। তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভর্তির শর্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।