হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

শিক্ষার্থীদের চোখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: সংকট ও প্রত্যাশা

একটি সনদ হাতে পেলেই কি শেষ হয় শিক্ষার্থীর পথচলা? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখো শিক্ষার্থীর বাস্তবতা বলছে, প্রশ্নটি আরও গভীর। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, অনিয়মিত পরীক্ষা, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসুবিধার ঘাটতি এবং মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার মধ্য দিয়েই এগোতে হচ্ছে অনেককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় দেখা দেয় আরেক বাস্তবতা। সনদের সঙ্গে দক্ষতার ব্যবধান। তবু এই বাস্তবতার মধ্যেই বদলের প্রত্যাশা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা চান এমন শিক্ষা, যা পরীক্ষার খাতার পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও কাজে আসে। তাঁদের প্রত্যাশা, সংকট কাটিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনা তৈরির জায়গা। এসব বিষয় নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন তানজিল কাজী।

তানজিল কাজী

শিক্ষার্থীরা

কাজী সানজিদা ইসলাম শীতল। ছবি: সংগৃহীত

লাইব্রেরি-ল্যাবহীন ক্যাম্পাস

জেলা ও উপজেলার অনেক অধিভুক্ত কলেজে আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত বইয়ের লাইব্রেরি, কম্পিউটার ও বিষয়ভিত্তিক ল্যাব না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ থাকছেন। ফলে ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগও কমছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতিতেও। শিক্ষকসংকট, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, যাতায়াতের সমস্যা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি বা কোচিংয়ে যুক্ত থাকাও এর কারণ। এই পরিস্থিতি বদলাতে প্রতিটি কলেজে কার্যকর লাইব্রেরি, আধুনিক ল্যাব ও ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস, ব্যবহারিক শিক্ষা ও অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিক্ষকসংকট দূর করে কলেজগুলোর ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর করা জরুরি।

কাজী সানজিদা ইসলাম শীতল

শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ,

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

নিয়ামত উল্লাহ রবি। ছবি: সংগৃহীত

সেশনজট ও দক্ষতার ঘাটতি

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সমস্যা সেশনজট। পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময় না থাকায় শিক্ষাজীবনে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। এর সঙ্গে রয়েছে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ হলেও চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীর দূরত্ব থেকে যায়। এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক কাঠামো আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। শিক্ষায় যুক্ত করতে হবে বাস্তবমুখী ও আধুনিক বিষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো কর্মক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট বিষয় শেখার সুযোগ থাকা দরকার। প্রতিটি কলেজে ডিজিটাল ল্যাব ও ল্যাব সহকারী নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেই ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে একটি জব পোর্টাল বা ক্যারিয়ার সেকশন চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা চাকরির তথ্য সহজে পেতে পারেন; পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগও প্রয়োজন।

নিয়ামত উল্লাহ রবি

শিক্ষার্থী, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজশাহী

তাসনিম আক্তার কনা। ছবি: সংগৃহীত

সনদ ও দক্ষতার সমন্বয় জরুরি

বর্তমান চাকরির বাজারে শুধু শিক্ষাগত সনদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের অনেক শিক্ষার্থী একাডেমিক যোগ্যতা অর্জন করেও ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। পরীক্ষায় ভালো ফলের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে যোগাযোগ দক্ষতা, কম্পিউটার জ্ঞান, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের মতো দক্ষতা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। এ কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কম্পিউটার, ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইন্টার্নশিপের সুযোগও বাড়াতে হবে। সনদ শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিচয় দেয়, আর দক্ষতা সেই জ্ঞানকে কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে। তাই ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য সনদ ও দক্ষতার সমন্বয় জরুরি।

তাসনিম আক্তার কনা

শিক্ষার্থী, হিসাববিজ্ঞান, ঢাকা সিটি কলেজ

মো. মেহেরাব হোসেন রিফাত। ছবি: সংগৃহীত

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার পরিসর বাড়ানো

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের তুলনায় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ এখনো সীমিত। বই, নোট ও পরীক্ষানির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফল করলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে সমস্যায় পড়েন। শেখার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ না থাকলে চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যথাযথভাবে গড়ে ওঠে না। তাই শিক্ষার্থীদের প্রকল্প, গবেষণা, মাঠপর্যায়ের কাজ, স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। এতে পাঠ্যবিষয়ের পাশাপাশি নিজের চিন্তা প্রকাশ, দায়িত্ব নেওয়া ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় তাই বইয়ের পাশাপাশি অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখার পরিসর বাড়ানো প্রয়োজন।

মো. মেহেরাব হোসেন রিফাত

শিক্ষার্থী, ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি, বিএম কলেজ, বরিশাল

অনামিকা চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানের সংকট নতুন পথ তৈরির সুযোগও তৈরি করছে। সরকারি বা বেসরকারি চাকরির অপেক্ষায় না থেকে অনেক তরুণ পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কুটিরশিল্প, আইটি সেবা, বুটিক ও খাদ্যভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হয়ে কেউ কেউ নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। একই সঙ্গে অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ও পরিশ্রম তাঁদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রাথমিক সহায়তার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ পেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা চাকরিপ্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির পথেও এগিয়ে যেতে পারেন।

অনামিকা চৌধুরী

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ, ঢাকা