হোম > শিক্ষা

মজায় মজায় শেখা

বাজরিগার পাখি থেকে পড়ালেখা শেখার কৌশল

কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব 

বাজরিগার পাখি। ছবি: লেখক

খাঁচার ভেতর কিচিরমিচির করা সেই ছোট্ট সুন্দর পাখিটা, যার মস্তিষ্কের ওজন পঞ্চাশ পয়সার কয়েনের অর্ধেক। অথচ শেখার ব্যাপারে সে রীতিমতো ওস্তাদ! কীভাবে আরও কায়দা করে সহজে শেখা যায়, তা জানতে সেই বাজরিগারের কাছে হাজির কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব!

বাজি আপু, তুমি এত দ্রুত শেখো কীভাবে

আমরা খুবই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি। কখনো কখনো একে অপরকে নকল করি। এর ভালো নাম ‘দেখে শেখা’। কখনো কখনো মনে হয় অস্টিন ক্লেওনের ‘স্টিল লাইক এন আর্টিস্ট’ বইটা যেন আমাদেরকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা হয়েছে। বইটার মূল বক্তব্য হচ্ছে অন্যের ভালো কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তা থেকে নিজের মতো করে নতুন কিছু তৈরি করা, অন্ধভাবে নকল করা নয়। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, আমাদের একজন খাবারের বাক্সের ছিপি যেভাবে সরায়, ঠেলে বা টেনে, পাশ থেকে দেখে অন্য বাজরিগারও তা চটপট শিখে নেয়। আমরা হাজারবার ঠোকাঠুকি করে সময় নষ্ট করি না; যে পেরেছে, তার কায়দাটা দেখে নিই। তোমরাও তাই করতে পারো। সহপাঠী কোনো অঙ্ক দ্রুত মেলাতে পারলে মাথার চুল না ছিঁড়ে তার কাছ থেকে শিখে নাও।

শুনেছি, তোমরা অনেক কথা বলতে পারো?

গর্ব করে বলতে পারি! যুক্তরাষ্ট্রে পাক নামের এক বাজরিগার ১ হাজার ৭২৮টি শব্দ শিখে ১৯৯৫ সালে গিনেস বুকে নাম তুলেছিল। পৃথিবীর আর কোনো পাখি আজও তাকে হারাতে পারেনি। ছয় মাস ধরে ২১ জন পর্যবেক্ষক আলাদাভাবে যাচাই করে তবেই স্বীকৃতি মিলেছিল। কিন্তু মনে রেখো, আমরা কেউ কথা বলা শিখে জন্মাই না। আমরা তোমাদের কথা মন দিয়ে শুনি, নিজের মনে বিড়বিড় করে বারবার আওড়াই, ভুল হয়, তবু আবার আওড়াই। আমরা শেখার সময় লজ্জা বা ভয় পাই না। তোমার ইংরেজি উচ্চারণ কিংবা গিটারের সুর ভুল হলে ভেবো না তুমি পারছ না। ওটাই তোমার মস্তিষ্কের মহড়া।

এ তো খুব চমৎকার তথ্য! অর্থাৎ কোনো কিছু শিখতে গিয়ে না পারলে থেমে যাওয়া চলবে না। আপু, শুনেছি তোমরা দল বেঁধে থাকতে পছন্দ করো। এতে উপকার কী?

অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে আমাদের পূর্বপুরুষেরা হাজারে হাজারে মিলেমিশে ঝাঁক বেঁধে থাকত। কোথায় খাবার, পানি আছে, কোথায় বিপদ—একজনের খবর মুহূর্তে সবার কাছে পৌঁছে যেত। সেখানকার আদিবাসীদের কাছে আমাদের ঝাঁক তাই একতা আর ভাগাভাগি করা জ্ঞানের প্রতীক। একা পড়ার চেয়ে দুজন মিলে পড়লে তোমাদেরও

তাই হবে।

শুধু পড়লেই চলবে?

মোটেই না! খাঁচায় ঘণ্টা, দড়ি বা খেলনা না থাকলে আমরা বিরক্ত হয়ে চুপ মেরে যাই, নতুন কিছু শেখা বন্ধ করে দিই। আমরা ছোট ছোট পাজল মেলাতে ওস্তাদ এবং এই খেলাটা আমরা খুব পছন্দ করি। তোমার মস্তিষ্কেরও খেলার মাঠ লাগে। টানা বইয়ে মুখ গুঁজে থাকলে হয় না। মাঝে উঠে একটু দৌড়ে এসে পড়তে বসলে, বিরতিতে একটু খেলাধুলা করলে, দাবা, রুবিক্স কিউব এবং অন্যান্য পাজল নিয়মিত মেলালে পড়া শেখাটা বেশি কার্যকর হয়।

শেষ একটা পরামর্শ দাও, প্লিজ

আজ যা শিখেছ, তা আজই কাউকে শিখিয়ে দাও। ছোট ভাইবোন, বন্ধু বা বাবা-মাকে। শিখিয়ে দেখলেই বুঝবে, তুমি নিজে কতটুকু বুঝেছ। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতে তুমি যদি কোনো একটা বিষয় ছয় বছরের শিশুকে বোঝাতে না পারো, তবে ধরে নিতে হবে যে তুমি নিজেই ব্যাপারটা ঠিকভাবে বুঝোনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইনম্যানের শেখার একটা কৌশল আছে। একে বলে ‘ফেইনম্যান টেকনিক’। এই কৌশল অনুযায়ী প্রথমে বেছে নিতে হবে তুমি কী শিখতে চাও, সেটা শিখে একটা ছোট শিশু বা নতুন কাউকে সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে। তারপর তোমার যেসব জায়গায় বোঝাতে অসুবিধা হয়েছে, তা বের করতে হবে। তারপর আবার তুমি যেখান থেকে শিখেছ, তা ঝালাই করতে হবে; অতঃপর সেটাকে আরও সহজ করে, উদাহরণ, গল্পসহকারে শেখানোর মতো সক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। আমরা পাখিরা হাজার বছর ধরে এভাবেই টিকে আছি: একজন শেখে, বাকিরা দেখে শেখে। আজ তবে আসি, আমার আজ অনেক কিছু শিখতে এবং শেখাতে হবে। নিয়মিত গল্প করতে এসো কিন্তু!

[নোট: পড়ার কৌশল। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী, এমনকি অভিভাবকদের জন্যও প্রযোজ্য]