হোম > শিক্ষা

চুয়েট-সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ: দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা

সিলেট প্রতিনিধি

উপাচার্য পদে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েট শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে। ছবি: আজকের পত্রিকা

উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) চলমান অচলাবস্থা ১৫ দিনে গড়িয়েছে। আন্দোলনের কারণে অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। নতুন করে পরীক্ষার সময়সূচিও দেওয়া হয়নি। অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে সেশনজটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই পরিস্থিতি সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষা সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, আন্দোলন শুরু হওয়ায় তা আর হয়নি। বড় ধরনের সেশনজটের আশঙ্কা করছেন এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও।

চুয়েটে অচলাবস্থা

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ একাডেমিক কার্যক্রম। আন্দোলনের কারণে অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। নতুন করে পরীক্ষার সময়সূচিও দেওয়া হয়নি। ক্লাস বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমও পিছিয়ে যাচ্ছে। অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে সেশনজটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে ওই রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন থেকে শুরু হয় কমপ্লিট শাটডাউন। এর সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। এতে করে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।

এদিকে ১৪ দিন ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চুয়েট ক্যাম্পাসভিত্তিক থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার তাঁরা চট্টগ্রাম নগরীতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন। মানববন্ধনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই আদর্শ সামনে রেখে নতুন ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে যে নবজাগরণের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, চুয়েটের শিক্ষার্থীরা সেই দেশেরই তরুণ প্রজন্ম। তাঁরা আশা করেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের যৌক্তিক দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন।

এই বিষয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী যুলকারনাইন মিহাদ বলেন, ‘আজকে আমাদের আন্দোলনের ১৫তম দিন। আমরা ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখতে চাই না। আমাদের শিক্ষাজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে যে দাবিতে আমরা আন্দোলনে নেমেছি, সেটির গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘১৫ দিন ধরে ক্যাম্পাস অচল। এতে আমাদের পরীক্ষা পিছিয়ে যাচ্ছে, একাডেমিক ক্যালেন্ডারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত সমাধান হলে আমরা সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাব। আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত আসুক এবং চুয়েটে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসুক।’

এদিকে এই অচলাবস্থা নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির সদস্যরা কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম অনলাইনে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আন্দোলনের কারণে ক্যাম্পাসে তাঁর সরাসরি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এই বিষয়ে চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

সিলেটে হতাশ শিক্ষার্থীরা

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সব প্রশাসনিক কার্যক্রম কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন থেকে মুক্ত করতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তাতে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষাকার্যক্রম। কলেজ সূত্রে জানা যায়, তিনটি ডিপার্টমেন্টেরই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষা সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, আন্দোলন শুরু হওয়ায় তা আর হয়নি। এ কারণে তারা বড় ধরনের সেশনজটের আশঙ্কা করছেন। এদিকে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইইই, সিএসসি, সিভিলের চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অধীর আগ্রহে আছেন এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি সমাধান আসলে তাঁরা যথাসময়ে পরীক্ষা দিতে পারবেন।

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিএসই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, ‘ক্লাস চলাকালীনও আমাদের এক্সাম, যেখানে ছয় মাসে এক্সাম হওয়ার কথা, সেখানে আমাদের এক্সামগুলো দেখা যেত যে আরও বেশি সময় হতো। সাত মাস আট মাসের মধ্যে এক্সাম হতো। এতে সেশনজট হচ্ছে। যার কারণে আমরা নির্দিষ্ট সময়ের চেয়েও ছয় মাসের বেশি সময়ে পিছিয়ে আছি।’ এই জট আরও দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা এই শিক্ষার্থীর।

২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তিনটি বিভাগের পাঁচটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী আছেন। কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে পুরো কার্যক্রম শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিতে হবে। অন্যথায় কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে। এ দাবিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলন এখনো চলছে।

এ প্রসঙ্গে কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শিব্বির আহমদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়েছি আর বোঝাচ্ছিও। কিন্তু তারা আন্দোলন থেকে সরতেছে না।’

এ বিষয়ে নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ ড. মো. সাহিদ ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরলে আশা করা যায় আর সমস্যা হবে না। আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে তাদের সেশনজটের সমস্যার সমাধান করে নেব।’

তবে শিক্ষার্থীরা চাইছেন এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হোক। এ নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠকও হয়েছে। তবে এতে সুরাহা হয়নি। ফলে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এ প্রসঙ্গে কলেজের সিভিল ডিপার্টমেন্টের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এই সেমিস্টার আমরা অলরেডি পরীক্ষার মাঝখানে গ্যাপ দিয়ে আন্দোলন করতেছি। ঠিক এর আগের একটা সেমিস্টার টু-টু, সেই সেমিস্টারটাতেও সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিছি এক মাসের জায়গায় অলমোস্ট তিন মাস ধরে। তো ওইখানেও আমাদের একটা বড় ঘাটতি হইছে। এভাবে আমাদের সেশনজট হইতেছে, যেটা নিয়ে আসলে কারিগরি ক্যাবিনেটের কোনো মাথাব্যথা নেই।’