বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীর সফলতায় অভিভাবকের ভূমিকাই বেশি। একজন শিক্ষার্থীকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা ও পরিশ্রম করতে হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অভিভাবকের সহযোগিতা এবং তত্ত্বাবধানও জরুরি। সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে অভিভাবক কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দিতে পারেন।
প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত সন্তানের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা। সে ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, কার
সঙ্গে মিশছে, সময়মতো পড়তে বসছে কি না, ঠিকমতো খাওয়া ও ঘুম হচ্ছে কি না, মোবাইলে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে নজর রাখা প্রয়োজন।
সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে শুধু অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নৈতিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং ভালো চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
প্রত্যেক মা-বাবার কাছে তাঁর সন্তান অত্যন্ত স্নেহের এবং ভালোবাসার। যতই ব্যস্ততা থাকুক, সন্তানের নিয়মিত খোঁজখবর রাখুন, সন্তানকে সঙ্গ দিন। তার পড়াশোনা, বন্ধু, বিদ্যালয় ও দৈনন্দিন কাজের বিষয়ে কথা বলুন। মাঝেমধ্যে একসঙ্গে বিনোদন করুন, গল্প করুন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুললে সন্তান তার সমস্যা ও অনুভূতির কথা সহজে বলতে পারে। এতে অভিভাবকের পক্ষেও সন্তানের প্রয়োজন ও পরিবর্তনগুলো বোঝা সহজ হয়।
সন্তানের ভালো ফল বা ভালো কাজের প্রশংসা তাকে আরও ভালো করতে উৎসাহিত করে। তাই শুধু ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়, ভালো কাজের স্বীকৃতিও দিতে হবে। সন্তানের কোনো দুর্বলতা বা ভুল থাকলে তা নিয়ে অপমান না করে তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ ও সহযোগিতা করতে হবে। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি হবে।
অনেক অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পর নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করেন। কিন্তু সন্তান নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, শ্রেণিতে মনোযোগী কি না, পড়া ঠিকমতো সম্পন্ন করছে কি না এবং বিদ্যালয়ের নিয়মকানুন মেনে চলছে কি না—এসব বিষয়ে খোঁজ রাখা জরুরি।
অভিভাবকের উচিত শ্রেণিশিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। প্রয়োজনে বিদ্যালয়ে গিয়ে সন্তানের পড়াশোনা ও আচরণ সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারেন। এতে সন্তানও বুঝবে যে তার পড়াশোনা ও বিদ্যালয়জীবনের বিষয়ে অভিভাবক সচেতন।
সন্তানের কাছে নিয়মিত বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় জানতে চাওয়া উচিত। সেদিন কী পড়ানো হয়েছে, পরীক্ষা কবে, ফলাফল কেমন হয়েছে, শ্রেণিতে কত পেয়েছে, কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রয়োজনে বিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা ভালো। এতে পড়াশোনা বা আচরণের কোনো সমস্যা থাকলে তা দ্রুত বোঝা সম্ভব হয়।
বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের মোবাইল থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা কঠিন। তবে প্রয়োজনের বাইরে মোবাইল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা জরুরি। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত ও মানসিক ক্ষতির বিষয়গুলো সন্তানকে সহজভাবে বোঝাতে হবে।
অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সন্তানের সামনে অপ্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার না করে পড়াশোনা, খেলাধুলা, বিশ্রাম ও পারিবারিক সময়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সন্তান যেন এর অপব্যবহারে জড়িয়ে না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
সন্তানের ভুল বা অনিয়ম হলে প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে শাসন করা অভিভাবকের দায়িত্ব। তবে শাসন যেন হয় ভালোবাসা, বোঝাপড়া ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে। অতিরিক্ত প্রশ্রয় যেমন সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি কঠোর আচরণও তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তানের বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভুলের কারণ বোঝানো এবং সঠিক পথে ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থীর সফলতার পেছনে বিদ্যালয় ও শিক্ষকের পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত তত্ত্বাবধান, সময় দেওয়া, উৎসাহ, বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় শাসনের মাধ্যমে অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনা ও চরিত্র গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। পরিবারের সচেতন সহযোগিতাই একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়