হোম > শিক্ষা

পরীক্ষার আগের রাতে না ঘুমালে যা হারাও

কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব 

পরীক্ষা এলেই শোনা যায় সেই বুকভরা গৌরবের কথা—‘সারা রাত জেগে পড়েছি!’ কারও কারও কাছে না ঘুমানো যেন পরিশ্রমের মানদণ্ড। আসলেই কি তাই? শিক্ষার্থীদের হয়ে এই প্রশ্ন নিয়ে ঘুম আপার সঙ্গে কথা বলেছেন কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব।

ঘুম আপা, শিক্ষার্থীরা বলে পরীক্ষার আগের রাতে ঘুমানো মানে সময় নষ্ট। আপনি কী বলেন?

বেচারারা জানেই না যে ঘুম মানে মস্তিষ্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। ওরা যখন ঘুমায়, তখনই আমার নাইট শিফট শুরু হয়। সারা দিন যা পড়া হয়, তা মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস নামের অংশে অস্থায়ীভাবে জমা থাকে। ব্যাপারটা অনেকটা মোবাইলের র‍্যামের মতো। রাতে আমি সেই স্মৃতিগুলো বারবার বাজিয়ে দেখি, তারপর দরকারিগুলো সরিয়ে রাখি লং টার্ম মেমোরি হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি ভান্ডারে। কখনো এমএস ওয়ার্ডে কাজ করে ফাইল সেভ না করে কম্পিউটার বন্ধ করে দিয়ে আফসোস করেছ? আমাকে বাদ দেওয়া মানে ঠিক এ কাজটাই করা! অর্থাৎ তুমি পড়বে ঠিকই; কিন্তু অধিকাংশ পড়া হয়ে যাবে গায়েব।

না ঘুমালে ক্ষতি কতটা?

ঘুম শুধু দিনে শেখা স্মৃতিগুলো পাকাপোক্ত করে না। ২০০৭ সালে নেচার নিউরোসায়েন্স সাময়িকীতে ড. ম্যাথু ওয়াকার ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, এক রাত না ঘুমালে পরদিন নতুন তথ্য মাথায় ঢোকানোর ক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ তুমি না ঘুমিয়ে জেনে-বুঝে পরদিন একটা ছিদ্রযুক্ত কলসে পানি ভরতে যাচ্ছ। মস্তিষ্কের ছবি তুলে তাঁরা দেখিয়েছেন, না ঘুমানো মানুষের হিপোক্যাম্পাস রীতিমতো অলস হয়ে পড়ে। সারা রাত জেগে পড়া মানে ছিদ্রযুক্ত কলসে পানি ভরে আশা করা যে পুরো পানি সেখানে থাকবে।

সাংঘাতিক! আর কী কী ক্ষতি হতে পারে?

আমি শুধু স্মৃতি জমিয়ে রাখি না, গুছিয়েও রাখি এবং সেই স্মৃতিকে ভবিষ্যতে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলি। ২০০৪ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের শিখিয়ে-পড়িয়ে একটা অঙ্কের ধাঁধা দেওয়া হয়েছিল, যার সমাধানে লুকানো ছিল একটা সহজ শর্টকাট নিয়ম। যাঁরা শেখার পরে ঘুমিয়েছিলেন, তাঁদের ৫৯ শতাংশ নিয়মটি ধরে ফেলেছিলেন; আর যাঁরা জেগে ছিলেন, তাঁদের মাত্র ২২ শতাংশ। কোনো কিছু শিখে সেটা সৃজনশীল কাজে লাগানোর যে বুদ্ধি দরকার, সেটা আমি ঘুমের মধ্যে সাজিয়ে দিই। তুমি ঠিকমতো ঘুমালে পরীক্ষায় প্রশ্ন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে এলেও তার সমাধান বের করে ফেলার সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যাবে। অন্যথায় পরীক্ষার হলে তোমার ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হবে।

তোমাদের আরও জানা থাকা উচিত যে অপর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি, মানসিক ভারসাম্য ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কত ঘণ্টা ঘুম দরকার?

ঘুমবিজ্ঞানীদের পরামর্শ, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, আর বড়দের অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম দরকার। তুমি যতক্ষণ ঘুমিয়ে পর্যাপ্ত ঘুম বোধ করো, ততটাই তোমার জন্য সঠিক ঘুম।

তাহলে পরীক্ষার আগের রাতে ওদের কী করা উচিত?

নতুন অধ্যায় ধরে বসা নয়; যা পড়া আছে, তার মূল পয়েন্টগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে বই বন্ধ করা। ঘুমানোর ঠিক আগে পড়া জিনিসটা আমি সবচেয়ে যত্ন করে গুছিয়ে রাখি। পরীক্ষার হলে বসে ‘জানতাম তো, মনে পড়ছে না’ অবস্থা যেন কারও না হয়। তাই ওদের বলবে বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। আজ তবে আসি। সোনামণিদের ঘুম পাড়াতে হবে। শুভরাত্রি!