বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়। উন্নত শিক্ষা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, ভালো কর্মপরিবেশ এবং ভবিষ্যতে বৈধভাবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সম্ভাবনাও অনেক পরিবারের সিদ্ধান্তে জায়গা করে নেয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর একটি।
এর বাস্তব ভিত্তিও আছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসের সরকারি উপাত্তে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের শীর্ষ পাঁচ উৎস দেশের একটি; মোট আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর প্রায় ৪ শতাংশ বাংলাদেশি।
তবে সাম্প্রতিক কিছু খবর অনেককে ভাবাচ্ছে। শিক্ষার্থী ভিসার ফি বেড়েছে, অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি বাড়ছে, আর পলিন হ্যানসনের ওয়ান নেশন তিন বছরে ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি অস্থায়ী ভিসা কমানোর রাজনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, অস্ট্রেলিয়ার দরজা কি তাহলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? উত্তর হলো, না। তবে প্রস্তুতির ধরন বদলাচ্ছে।
প্রথমে একটি পার্থক্য পরিষ্কার রাখা দরকার। ওয়ান নেশনের ৭ লাখ ৫০ হাজার অস্থায়ী ভিসা কমানোর কথা বর্তমান অস্ট্রেলীয় সরকারের নীতি নয়; এটি দলটির রাজনৈতিক প্রস্তাব।
বর্তমান সরকারও নিট বিদেশি অভিবাসন কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সরকারি তথ্যে নিট বিদেশি অভিবাসন ২ লাখ ৯২ হাজারে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে; বাজেট পূর্বাভাসে ২০২৬-২৭ সালে ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং ২০২৭-২৮ সালে ২ লাখ ২৫ হাজারের কথা রয়েছে।
তবে অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেওয়া বন্ধ করছে না। ২০২৭ সালে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী গ্রহণের পরিকল্পিত সংখ্যা ২ লাখ ৯৫ হাজার রাখা হয়েছে, যা ২০২৬ সালের সমান। এটি মোট শিক্ষার্থী ভিসার সরাসরি সীমা নয়; বরং আন্তর্জাতিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণের অগ্রাধিকারের অংশ।
অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারেন।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে শিক্ষার্থী ভিসার মূল আবেদন ফি ২ হাজার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর ১২ মাসের জীবনযাপনের আর্থিক সক্ষমতার নির্ধারিত অঙ্ক অন্তত ২৯ হাজার ৭১০ অস্ট্রেলীয় ডলার; এর বাইরে শিক্ষার ব্যয়, ভ্রমণ ও অন্য খরচও বিবেচনায় আসে।
শুধু অর্থ থাকলে হবে না। ‘প্রকৃত শিক্ষার্থী’ শর্তে কেন অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে চান, কেন এই কোর্স ও প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছেন এবং পড়াশোনা ভবিষ্যতে কীভাবে কাজে লাগবে, সেগুলো বিবেচিত হয়। তাই আবেদন করার সময় পুরোনো তথ্য নয়, তখনকার কার্যকর নিয়ম দেখুন।
পরিচিতজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা এজেন্টের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী একজন শিক্ষার্থী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজে যাচাই করা ভালো।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ভর্তির যোগ্যতা, শিক্ষার ব্যয়, ইংরেজি ভাষার শর্ত, সময়সীমা ও বৃত্তির তথ্য মিলিয়ে নিন। পিএইচডি বা গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রির ক্ষেত্রে গবেষণাবিষয়ক শব্দ দিয়ে সম্ভাব্য সুপারভাইজার খুঁজুন এবং তাঁর সাম্প্রতিক কাজ দেখে প্রয়োজন হলে সরাসরি যোগাযোগ করুন।
সাধারণ শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা শিক্ষাকাল চলাকালে প্রতি দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন; নির্ধারিত শিক্ষাবিরতিতে এই সীমা থাকে না। গবেষণাভিত্তিক স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গবেষণা ডিগ্রি শুরু হওয়ার পর এই সীমা প্রযোজ্য নয়।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ২৬.৪৪ অস্ট্রেলীয় ডলার, যদিও অনেক পেশায় আলাদা মজুরি কাঠামো রয়েছে। কাজের আয় দৈনন্দিন ব্যয়ে সহায়তা করতে পারে, তবে পুরো শিক্ষার ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ ভবিষ্যৎ খণ্ডকালীন আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা করা বাস্তবসম্মত নয়।
অবশ্যই যায়। তবে সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব প্রস্তুতিও থাকতে হবে। নিজের শিক্ষাগত ফলাফল, ইংরেজি ভাষার প্রস্তুতি, আর্থিক সক্ষমতা, কোর্সের উপযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আগে বিবেচনা করুন। বৃত্তি, শিক্ষার ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ তুলনা করুন। গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রির ক্ষেত্রে সুপারভাইজার ও অর্থায়নের সুযোগ দেখুন।
অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়নি; পথটি এখন আরও তথ্যনির্ভর, ব্যয়-সচেতন এবং ভালো প্রস্তুতি দাবি করছে। তাই কয়েকটি নেতিবাচক শিরোনাম দেখে স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়ার কারণ নেই, আবার যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার সফল যাত্রা ভিসা পাওয়ার দিন থেকে শুরু হয় না; শুরু হয় নিজের সামর্থ্য বুঝে, সঠিক তথ্য যাচাই করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন থেকেই।
লেখক: পিএইচডি গবেষক ও শিক্ষক দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া