মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি প্রফেশনাল পরীক্ষা আলাদা ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। বিষয় ও সিলেবাসের ধরন অনুযায়ী প্রস্তুতির কৌশলেও থাকে পার্থক্য। তাই শুরু থেকে কোন প্রফে কোন বিষয়কে কীভাবে গুরুত্ব দিতে হবে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে প্রস্তুতি অনেক বেশি গোছানো হয়। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী সাফিয়া তাসনিম সেমন্তি।
প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষা মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কারিকুলাম ও বড় সিলেবাসের কারণে কিছুটা চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে। এ পরীক্ষায় অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি—এই তিনটি বিষয় থাকে। এর মধ্যে অ্যানাটমির সিলেবাস সবচেয়ে বড়। অ্যানাটমিতে রিজিওনাল অ্যানাটমি, জেনারেল অ্যানাটমি, এমব্রায়োলজি ও হিস্টোলজিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রিজিওনাল অ্যানাটমিতে নিয়মিত রিভিশন ও ফিগার অনুশীলন জরুরি। হিস্টোলজিতে আইডেন্টিফিকেশন পয়েন্টগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ল্যাবে নিয়মিত স্লাইড দেখার মাধ্যমে এগুলোর চর্চা করা প্রয়োজন।
একইভাবে এমব্রায়োলজিও গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে। জন্মগত ত্রুটি, বিভিন্ন রোগ ও ক্লিনিক্যাল বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে এমব্রায়োলজির জ্ঞান পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জেনারেল অ্যানাটমিও অবহেলা করা যাবে না। এ অংশ থেকেও পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে।
ফিজিওলজি মুখস্থের চেয়ে বুঝে পড়ার বিষয়। বিষয়গুলো যত ভালোভাবে বোঝা যাবে, পরবর্তী সময়ে মেডিসিনসহ অন্য ক্লিনিক্যাল বিষয় বোঝাও তত সহজ হবে। ক্লাস লেকচার ও মূল বই, যেমন গাইটন বা গ্যানন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে শিক্ষামূলক ভিডিওর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
বায়োকেমিস্ট্রিতে মেটাবলিজম ও অ্যাসিড-বেস ডিসঅর্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে, তিনটি বিষয়েই নিয়মিত পড়াশোনা ও বারবার রিভিশনের অভ্যাস প্রথম প্রফের প্রস্তুতিকে সহজ করে তুলবে।
দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় ফার্মাকোলজি ও ফরেনসিক মেডিসিন, দুটি বিষয়ের ওপর পরীক্ষা দিতে হয়। ফার্মাকোলজিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো টপিক বাদ না দিয়ে পড়ার পাশাপাশি প্রতিটি ওষুধের মেকানিজম, ইন্ডিকেশন ও অ্যাডভার্স ইফেক্ট ভালোভাবে বুঝে শেখা জরুরি। শুধু মুখস্থ না করে ওষুধ কীভাবে কাজ করে এবং কোন রোগে কেন ব্যবহার করা হয়, তা বুঝে পড়লে বিষয়গুলো মনে রাখা সহজ হয়। ভবিষ্যৎ চিকিৎসাজীবনেও এ জ্ঞান কাজে আসে।
ফরেনসিক মেডিসিনে উইপন, ইনজুরি, হার্ট ও পয়জন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত রিভিশনের মাধ্যমে এসব বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। কারণ, এ জ্ঞান শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, ভবিষ্যতে বিভিন্ন মেডিকো-লিগ্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি ও কমিউনিটি মেডিসিন, তিনটি বড় বিষয়ের ওপর পরীক্ষা দিতে হয়। এক বছরে তিনটি বিষয়ের প্রস্তুতি নেওয়া চ্যালেঞ্জিং হলেও পরিকল্পিতভাবে পড়লে তা সম্ভব।
প্যাথলজি মুখস্থ না করে বুঝে পড়ার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে জেনারেল প্যাথলজির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মূল বই রবিনস থেকে পড়লে বেসিক ভালোভাবে তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে মেডিসিনের বিভিন্ন বিষয় বুঝতেও এটি সহায়ক হবে।
মাইক্রোবায়োলজিতে ব্যাকটেরিওলজি, ভাইরোলজি ও ইমিউনোলজির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভালোভাবে পড়তে হবে। এসব বিষয়ের জ্ঞান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইনফেকশাস ও প্যারাসাইটিক ডিজিজ বোঝার ক্ষেত্রেও কাজে আসবে।
কমিউনিটি মেডিসিনের সিলেবাসও বেশ বড়। এখানে বিভিন্ন সংজ্ঞা ও তথ্য মনে রাখার পাশাপাশি এপিডেমিওলজি ও বায়োস্ট্যাটিস্টিকসে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত রিভিশনের মাধ্যমে তথ্যগুলো আয়ত্ত করার পাশাপাশি এসব বিষয়ের ব্যবহারিক দিকও বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
চতুর্থ বা ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রধান বিষয় মেডিসিন, সার্জারি এবং গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স। এ পর্যায়ে সিলেবাস অনেক বড় হওয়ায় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর না করে শুরু থেকে নিয়মিত পড়াশোনা করা জরুরি।
মেডিসিনের সিলেবাস বিশাল। তাই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ সম্পর্কে অন্তত পরিষ্কার ধারণা রাখার চেষ্টা করতে হবে। ক্লাস লেকচারের পাশাপাশি পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন নিয়মিত অনুশীলন করা এবং গুরুত্বপূর্ণ টপিক ডেভিডসন থেকে পড়া যেতে পারে। এতে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি ভাইভাতেও উপকার পাওয়া যাবে। পেডিয়াট্রিক্সের জন্য আবিদ মল্লা স্যার বা এম আর খান স্যারের বই অনুসরণ করা যেতে পারে।
সার্জারির জেনারেল সার্জারি অংশটি তুলনামূলকভাবে বড়। তাই এটি আগে থেকেই শুরু করে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বারবার রিভিশন করার পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্সেও গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো নিয়মিত পড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে দত্ত অনুসরণ করা যেতে পারে।
ফাইনাল প্রফে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই লং কেস ও শর্ট কেস নিয়মিত অনুশীলন করা প্রয়োজন। সহপাঠীর সঙ্গে প্র্যাকটিস করলে একে অপরের ভুলগুলো চিহ্নিত করা এবং ক্লিনিক্যাল প্রেজেন্টেশনে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো সহজ হয়।
এ ছাড়া এক্স-রে ও ইসিজি পরীক্ষার ঠিক আগে শেখার পরিবর্তে বছরের শুরু থেকেই অল্প অল্প করে অনুশীলন করা উচিত। এতে ধীরে ধীরে ভালো ধারণা তৈরি হবে এবং পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপও কমবে।
সব প্রফেশনাল পরীক্ষায় ভালো করার ক্ষেত্রে পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক চাপ ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টও গুরুত্বপূর্ণ। মেডিকেলের পড়াশোনা অনেকটা ম্যারাথন দৌড়ের মতো, এটি কোনো স্প্রিন্ট নয়। তাই প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আগের পড়াগুলো নিয়মিত রিভিশন দিতে হবে এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
একসঙ্গে বড় সিলেবাস দেখে ঘাবড়ে না গিয়ে পড়াগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে একটি বাস্তবসম্মত রুটিন অনুযায়ী এগনো ভালো। এতে পড়াশোনার চাপ কম মনে হবে এবং প্রস্তুতিও আরও গোছানো হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। অন্য কেউ কতটুকু পড়ছে বা কত ভালো করছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই উচিত। নিয়মিত পরিশ্রম, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।
গ্রন্থনা: নুসরাত জাহান অর্পিতা