টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, আর সেখানে ঋত্বিকা ফারজানা ঋতুর গান থাকবে না—এমনটা যেন কল্পনাই করা যায় না। অনুষ্ঠান মানেই তাঁর নাম ঘোষণার প্রতীক্ষা। মঞ্চে যখন ভেসে আসে—‘এবার গান পরিবেশন করবে ঋতু’— সে সময় করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। যেন অনুষ্ঠানের প্রাণভোমরাই তিনি। কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে সমান স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাঁর। সম্প্রতি কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি সম্পন্ন করেছেন ঋতু। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তিনি তাঁর সুরেলা ও মায়াবী কণ্ঠের জন্যই বেশি পরিচিত।
টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিবেশে ঋতুর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর সংগীতযাত্রার সূচনা। শুরুটা ছিল নিছক আগ্রহের। কিন্তু তাঁর গানের শিক্ষক খুব দ্রুতই তাঁর কণ্ঠের সম্ভাবনা বুঝে ফেলেন। সেই থেকে জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাস, শুরু হয় গানের চর্চা।
ঋতুর সবচেয়ে বড় প্রেরণা তাঁর মা পাপিয়া বেগম। ছোটবেলায় নিজের অপূর্ণ সংগীতশিক্ষার স্বপ্ন মেয়ের হাত ধরে পূরণ করার নীরব বাসনাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। মায়ের সেই অকৃত্রিম উৎসাহই ঋতুর পথচলার প্রধান শক্তি।
২০১৬ সালে ক্ষুদে গানরাজে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান জানান দেয় ঋতু। সারা দেশের হাজারো প্রতিযোগীর মধ্যে শীর্ষ ৩৫-এ জায়গা পায়। পৌঁছে যায় স্টুডিও রাউন্ডেও। অভিজ্ঞ মেন্টরদের থেকে প্রশিক্ষণ এবং সহশিল্পীদের সঙ্গে গানের অভিজ্ঞতা সংগীতচর্চায় যুক্ত করে নতুন মাত্রা। পরবর্তী সময়ে আরেক প্রতিযোগিতা গানের রাজা-এর স্টুডিও রাউন্ডে শীর্ষ ২০-এ স্থান করে নেয় সে।
প্রতিযোগিতামূলক সংগীতাঙ্গনেও তাঁর সাফল্য উল্লেখ করার মতো। ২০১৭ সালে ‘গণজাগরণের গান’ প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন, ২০১৮ সালে জাতীয় শিশু-কিশোর পুরস্কার প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক গানে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার লাভ এবং ২০১৯ সালে একই প্রতিযোগিতায় লোকসংগীতে বিভাগীয় পুরস্কার পান ঋতু। ২০২০ সালে ভাবসংগীতে বিভাগীয় পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানে তাঁর ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে একাধিক পুরস্কার।
সংগীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও সচেতন ঋতু। সংগীতশিল্পী বারী দেওয়ান হৃদয়ের কাছে তালিম নেওয়ার পাশাপাশি উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুলসংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরার প্রতিষ্ঠান ‘সুর সপ্তক’-এ রাগসংগীত ও শাস্ত্রীয়সংগীতে শিক্ষা নিয়েছেন। করোনাকালে কিছুটা ছেদ পড়লেও ২০২২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের অধ্যাপক ড. অসিত রায়ের রাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ষড়জ পঞ্চম’-এর মাধ্যমে আবারও পুরোদমে চর্চায় ফেরেন ঋত্বিকা ফারজানা ঋতু।
কুমুদিনী সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কুশল ভৌমিক বলেন, ‘ঋতু শান্ত সকালের শিশিরবিন্দুর মতো। তার কণ্ঠ যেমন মুগ্ধতা জাগায়, তেমনি তার নম্রতা ও বিনয় তাকে করে তোলে আরও অনন্য।’
মা পাপিয়া বেগমের কণ্ঠে শোনা যায় গর্ব ও আশীর্বাদের সুর, ‘ছোটবেলায় আমার যে সুপ্ত বাসনা ছিল গান শেখার, তা আমার মেয়ে পূরণ করেছে। সে যেন বড় হয়ে দেশসেরা একজন শিল্পী হয়—এটাই আমার প্রত্যাশা। একই সঙ্গে সে যেন ভালো মানুষ হয়।’
ব্যক্তিগতভাবে ঋতু ভীষণ অনুপ্রাণিত সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, লতা মঙ্গেশকর ও শ্রেয়া ঘোষালের গানে। তাঁদের কণ্ঠের মাধুর্য ও সাধনার গল্প তাঁকে দারুণ অনুপ্রাণিত করে।
সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন ঋতু। তাঁর বিশ্বাস, নিয়মিত চর্চা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং মানুষের ভালোবাসাই তাঁকে পৌঁছে দেবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।