রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনটি দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীদের দখলে ছিল। প্রয়াত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এই আসনের এমপি ছিলেন। এবারের জাতীয় নির্বাচনে লাঙ্গল-নৌকার এই দুর্গে মূল লড়াই ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের মধ্যে হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা জামায়াতের মজলিসে শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য এবং পীরগঞ্জ ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিন। তিনি মজলিসুন মোফাচ্ছিরিন কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি এবং বক্তা হিসেবেও সুপরিচিত। অপর দিকে বিএনপি থেকে এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। তিনি উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের একজন সফল চেয়ারম্যান, তৃণমূল থেকে উঠে আসা বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
এ ছাড়াও জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুর আলম মিয়া যাদু, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ, ঈগল প্রতীকে এবি পার্টির ছাদেকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র ঘোড়া প্রতীকে আবু জাফর মো. জাহিদ নিউ, ফুটবল প্রতীকে খন্দকার শাহিদুল ইসলাম, সূর্যমুখী ফুল প্রতীকে তাকিয়া জাহান চৌধুরী। আবু জাফর মো. জাহিদ নিউ ও তাকিয়া জাহান চৌধুরী এনপিসির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
জামায়াতে ইসলামী অতীতের সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে থাকলেও এবারে জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী তারা। অপর দিকে বিএনপিও নিজেদের জয়ের আশায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির দুর্বল মনোভাব ও প্রার্থীর দায়সারা নির্বাচনী প্রচারণা দেখে ভোটাররা ঝুঁকছেন জামায়াত-বিএনপির দিকে। সব মিলিয়ে ভোটারদের ভাষ্য, নির্বাচনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
এই আসনে পরপর দুবার এমপি, পরপর তিনবার উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন নূর মোহাম্মদ মন্ডল ওরফে নুরু মন্ডল। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করতে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মাঠে নেমেছেন। আ.লীগের নেতা-কর্মীদের বিশাল একটি অংশও নুরু মন্ডলের নিয়ন্ত্রণে। ফলে আ.লীগের নেতা-কর্মীরা বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নুরু মন্ডলের ব্যক্তিগত ইমেজ এই আসনে দাঁড়িপাল্লার জয়লাভে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এদিকে এবি পার্টির ছাদেকুল ইসলামও বিএনপি প্রার্থীর প্রতি সমর্থন দিয়েছেন।
উপজেলার প্রতিটি হাটবাজার ও মোড়ের চায়ের টেবিল থেকে রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গনে ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা চলছে। ব্যক্তিগত ইমেজ ও দলের সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষায় কে শেষ হাসি হাসবেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, এটি নিয়ে দ্বিমত থাকলেও সবাই মোটামুটি একমত, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যেই মূল লড়াই হবে। নির্বাচনে লাঙ্গলের প্রার্থীর অস্তিত্ব থাকবে না, সে ব্যাপারে মোটামুটি একমত সবাই।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পীরগঞ্জবাসী যারা অভিজ্ঞ, ধর্মীয় চেতনায় যেসব মানুষ আছে, সবাই মিলে বিএনপিই হচ্ছে ইসলামি দলের সবচেয়ে বড় আস্থার ঠিকানা। পরকালের ভয় দেখিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ভোট আদায়ের চেষ্টা করছে একটি দল। মানুষের বিশ্বাস, এসব ধোঁকাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।’
জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা নুরুল আমিন বলেন, ‘ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। গণজোয়ার আমাদের পক্ষেই, ইনশা আল্লাহ।’
জাতীয় পার্টির লাঙ্গলের প্রার্থী নুর আলম মিয়া যাদু বলেন, ‘লাঙ্গল পীরগঞ্জের চেনা প্রতীক। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয় নিশ্চিত।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখার প্রার্থী সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ক্ষমতার সিঁড়ি হতে রাজনীতি করি না। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা আমাদের লক্ষ্য।’