ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় এবার নজিরবিহীন বিতর্কের সৃষ্টি হলো। খোদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রপৌত্র (নাতির ছেলে) চন্দ্র বসুকে নাগরিকত্বের প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য ‘এসআইআর’ শুনানিতে তলব করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নোটিস পাওয়া মাত্রই তীব্র বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক এই বিজেপি নেতা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘নেতাজির প্রপৌত্র আমি, আমাকেও নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে? কোন পথে এগোচ্ছে ভারত?’
বিতর্কের মাত্রা আরও বেড়েছে কারণ নোটিশটি শুধু চন্দ্র বসুর একার জন্য ছিল না। তাঁর স্ত্রী, কন্যা এবং বিদেশে থাকা দুই ছেলের নামেও একই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি সপরিবারে কলকাতার একটি কেন্দ্রে শুনানিতে হাজিরা দেন তিনি। চন্দ্র বসু জানান, বিদেশে থাকা ছেলেদের পক্ষ থেকে তিনিই প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে শুনানির পুরো প্রক্রিয়াটিকেই অত্যন্ত ‘পরিকল্পনাহীন ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর মতে, পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পরেও কমিশন স্পষ্ট করেনি যে তারা ঠিক কী ধরনের প্রমাণ চায়।
বিষয়টি নিয়ে শোরগোল শুরু হতেই রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি, চন্দ্র বসুর জমা দেওয়া এনুমারেশন ফর্মে ‘লিঙ্কেজ’ সংক্রান্ত কলামটি (যেখানে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকার তথ্য দিতে হয়) ফাঁকা ছিল। এই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তথ্যগত অসংগতির কারণেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কমিশন বারবার বলছে, তাদের কাছে সব ভোটারই সমান এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এটি করা হয়নি।
ভোটার তালিকা সংশোধনের এই নিবিড় প্রক্রিয়ায় হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন সমাজের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্টজনদের একাংশও। তালিকায় রয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার মহম্মদ শামি এবং তৃণমূল সংসদ সদস্য ও অভিনেতা দীপক অধিকারী (দেব)। এমনকি অমর্ত্য সেনের শান্তিনিকেতনের বাড়িতেও নোটিশ পাঠানোর অভিযোগ উঠেছিল। যদিও পরে কমিশন জানায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে ভুল সংশোধন করে নেওয়া হবে।
সুভাষ চন্দ্র বসুর নাতির ছেলে চন্দ্র বসু ২০১৪ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। ২০১৬ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে অংশও নিয়েছিলেন। তবে ২০২৩ সালে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি দল ত্যাগ করেন। এই প্রেক্ষাপটে তাঁকে নোটিশ পাঠানো কি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। চন্দ্র বসুর মতে, এই প্রক্রিয়াটি বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো করে করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে বয়স্কদের চরম ভোগান্তির মুখে ফেলছে।
নেতাজির পরিবার যদি ভারতীয় না হয়, তবে আর কে হবেন?—এই প্রশ্নে উত্তাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অনেকে বিষয়টিকে জাতীয় বীরের পরিবারের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে আসলে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সব মিলিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।