রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে মস্কোকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি মস্কোর বিষয় নয়।’ তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো (উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট) মিত্ররা এই বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, পুতিন আর্কটিক দ্বীপটির বাসিন্দাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন এবং গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের আওতায় আনার ট্রাম্পের প্রচেষ্টার প্রতি প্রকাশ্য উৎসাহ দেখিয়েছেন। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ড দখলের কারণ হিসেবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে হুমকির কথা উল্লেখ করেছিলেন।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে পুতিন টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে কী ঘটবে, তা আমাদের বিষয় নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ডেনমার্ক সব সময়ই গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে উপনিবেশের মতো আচরণ করেছে এবং তাদের প্রতি বেশ কঠোর, এমনকি নিষ্ঠুরও ছিল। কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় এবং আমি সন্দেহ করি বর্তমানে কেউ এতে আগ্রহী কি না।’
পুতিন বলেন, ‘এটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের উদ্বেগের বিষয় নয়। আমার মনে হয়, তারা এটি নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নেবে।’ এ সময় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯১৭ সালে ডেনমার্ক ভার্জিন আইল্যান্ডস আমেরিকার কাছে বিক্রি করেছিল। এ ছাড়া পুতিন উল্লেখ করেন, ১৮৬৭ সালে রাশিয়া মাত্র ৭ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে আলাস্কাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।
আমেরিকা-ইউরোপ উত্তেজনায় রাশিয়ার উচ্ছ্বাস
ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রতি মস্কোর এই নমনীয়তা এক সুপরিকল্পিত কৌশলের ইঙ্গিত দেয়, যার লক্ষ্য হলো—পশ্চিমা ঐক্যকে দুর্বল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে রাখা।
গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন রাশিয়ার কর্মকর্তা, রাষ্ট্র পরিচালিত গণমাধ্যম এবং ক্রেমলিনপন্থী ব্লগাররা উল্লাস, উপহাস এবং সতর্কতার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ কেউ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদের মতে, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোকে দুর্বল করবে, যা মস্কোর জন্য ইতিবাচক এবং এটি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিমের মনোযোগ কিছুটা সরিয়ে নেবে।
বিশ্লেষকেরা আরও লক্ষ করেছেন, ডেনমার্কের কাছ থেকে খনিজ সমৃদ্ধ এবং স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটির সম্ভাব্য মার্কিন অধিগ্রহণ রাশিয়ার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ, রাশিয়া আর্কটিক অঞ্চলের বিশাল অংশে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। মস্কো ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে, যা তাদের নর্দান ফ্লিটের ঘাঁটি এবং যেখানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছিল।
বুধবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক বক্তৃতায় ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন যে তিনি ’গ্রিনল্যান্ড পেতে চান’, তবে এ জন্য তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন না। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের উপহাস করেন এবং অঙ্গীকার করেন, ন্যাটো যেন মার্কিন সম্প্রসারণবাদে বাধা না দেয়।
ক্রেমলিন এই ইস্যুতে ট্রাম্পের সমালোচনা বা সমর্থন কোনোটিই করেনি। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গত সোমবার বলেছিলেন, ‘এটি ভালো কি মন্দ কিংবা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কি না, সেটি বিবেচনা না করেও বলা যায়—আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারেন, তবে তিনি কেবল আমেরিকার ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নেবেন। এই বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একমত না হওয়া কঠিন।’
মস্কোর এই সতর্ক অবস্থান বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের প্রতি তাদের জনসমক্ষে দেখানো নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাশিয়া ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তলানিতে ঠেকে যাওয়া সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার মাধ্যমে কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে।
পুতিন গত বছর বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আশ্চর্যজনক নয়। কারণ, এই অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯ শতকেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা করেছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেনমার্কের কাছ থেকে এটি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল।
এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, পুতিন তাঁর বিতর্কিত
বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদ যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন—যদিও ক্রেমলিন জানিয়েছে তারা এখনো আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে। দাভোসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তিনি গ্রহণ করেছেন। অনেকেই এটি গ্রহণ করেছেন।’
অগণতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প বলেন, কেউ কেউ ‘বিতর্কিত’, কিন্তু ‘আমি যদি বোর্ডে কেবল শিশুদের রাখি, তবে সেটি খুব বেশি কার্যকর হবে না।’
মস্কোয় পুতিন মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে জানান, তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আমাদের কাছে পাঠানো নথিগুলো পর্যালোচনা করতে এবং আমাদের কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরই আমরা আমন্ত্রণের জবাব দিতে পারব।’
তিনি আরও জানান, এই বোর্ডের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার জন্য যে ১০০ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে, রাশিয়া তা ‘আগের মার্কিন প্রশাসনের আমলে জব্দ করা রুশ সম্পদ’ থেকে পরিশোধ করতে পারে। তিনি যোগ করেন, এই সম্পদগুলো রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তিচুক্তি হওয়ার পর ‘যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলো পুনর্গঠনেও’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্থায়ী আসনের জন্য ১০০ কোটি ডলারের অনুরোধসহ বিশ্বের কয়েক ডজন নেতার কাছে আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। যদিও মূলত গাজা পুনর্গঠন তদারকির জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল, তবে এই বোর্ডের চার্টার বা সনদে এর ভূমিকা কেবল গাজায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এটি জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চায়, যা ফ্রান্সসহ কিছু মার্কিন মিত্রের ক্ষোভের কারণ হয়েছে।