জাপানের নিইগাতা প্রিফেকচারের কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান সড়কের প্রস্থ বাড়াতে মাটি সরানোর কাজ চলছে, একই সঙ্গে ভারী নিরাপত্তার মধ্যে একের পর এক লরি প্রবেশ করছে কেন্দ্রে। পুরো এলাকাজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দীর্ঘ পরিসীমা-ঘেরা বেড়াজুড়ে রেজার তার বসানো হয়েছে এবং সৈকতের পাশে একটি পুলিশ টহলগাড়ি দর্শনার্থীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। এই সৈকত থেকেই তুষারঢাকা ইয়োনেয়ামা পর্বতের পটভূমিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া জাপানের সাগর উপকূলে নিইগাতা প্রিফেকচারের ৪ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত। সাতটি রিঅ্যাক্টর পুরোপুরি চালু থাকলে কেন্দ্রটি সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা লাখ লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
তবে ২০১২ সাল থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র একেবারেই বন্ধ রয়েছে। ২০১১ সালের মার্চে ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিনটি রিঅ্যাক্টরের গলে যাওয়ার পর—যা চেরনোবিলের পর বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত—জাপানের অন্যান্য বহু রিঅ্যাক্টরের সঙ্গে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
টোকিও থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো)। ফুকুশিমা দাইইচি দুর্ঘটনার সময়ও এই প্রতিষ্ঠানই ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বে ছিল। সেসময় একটি শক্তিশালী সুনামি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ঢুকে পড়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, তিনটি রিঅ্যাক্টর গলে যায় এবং প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
ফুকুশিমা দুর্ঘটনার ১৫ তম বার্ষিকীর কয়েক সপ্তাহ আগে এবং ২০১১ সালের সুনামিতে জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানির স্মৃতি এখনো টাটকা থাকতেই, টেপকো কাশিওয়াজাকি-কারিওয়ার সাতটি রিঅ্যাক্টরের একটি পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয় জনমতের বিরোধিতা সত্ত্বেও রিঅ্যাক্টর নম্বর ৬ আগামী মঙ্গলবারের মধ্যেই চালু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিঅ্যাক্টরটি চালু হলে টোকিও অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ২ শতাংশ বাড়বে। জাপান সরকারের মতে, এটি দেশটির ধীরে ধীরে পারমাণবিক জ্বালানিতে ফিরে আসার কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সরকারের দাবি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ালে কার্বন নির্গমন কমানো যাবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে। ফুকুশিমার মতো কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নিতে হবে।
এই এলাকায় বসবাসকারী ৭৬ বছর বয়সী রিউসুকে ইয়োশিদার বাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দেড় মাইলেরও কম দূরে। পুনরায় চালু হওয়া নিয়ে তার উদ্বেগ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবকিছুই আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়।’ কারিওয়া গ্রামের এই বাসিন্দা পেশায় একজন মৃৎশিল্পী এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী বাসিন্দাদের একটি সংগঠনের সদস্য। তিনি বলেন, ‘সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাগুলো কার্যকর নয়। শীতকালে তুষারপাত হলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এখানে অনেক বয়স্ক মানুষ থাকেন। যারা চলাফেরা করতে পারেন না, তাদের কী হবে? এটি একটি মানবাধিকার সমস্যা।’
টেপকোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ফুকুশিমা দাইইচি দুর্ঘটনা থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে। স্থানীয়দের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের শুরুতে নিইগাতা প্রিফেকচারে আগামী ১০ বছরে ১০০ বিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন পাউন্ড) বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দীর্ঘদিন বন্ধের সময়ও বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৬ হাজার কর্মী দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে সেখানে সুনামির ক্ষতি কমাতে সমুদ্র প্রাচীর ও জলরোধী দরজা স্থাপন করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা রাখতে মোবাইল ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বিপুলসংখ্যক ফায়ার ইঞ্জিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে উন্নত ফিল্টারিং ব্যবস্থাও বসানো হয়েছে।
টেপকোর মুখপাত্র তাতসুয়া মাতোবা বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল বিষয় হলো সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বোঝাপড়া ও সম্মতি অপরিহার্য।’ তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ক্ষেত্রেই টেপকো ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রিফেকচারজুড়ে গণভোটের দাবি জানানো হলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করেছে। গণভোট না হওয়ায় পুনরায় চালুর বিরোধীরা বিভিন্ন জরিপের ফলাফল তুলে ধরছেন।
গত বছরের শেষ দিকে প্রিফেকচার সরকার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি মনে করেন, কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পুনরায় চালুর শর্ত পূরণ হয়নি। এ বিষয়ে তাতসুয়া মাতোবা বলেন, ‘প্রিফেকচারাল জরিপের ফলাফল আমরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছি। স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা অর্জন একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার কোনো শেষ নেই। এর জন্য আন্তরিকতা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা দরকার।’
কারিওয়া গ্রামের কাউন্সিল সদস্য কাজুইউকি তাকেমোতো বলেন, উত্তর-পশ্চিম জাপানের এই অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ৭৬ বছর বয়সী তাকেমোতো বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো যথাযথ আলোচনা হয়নি। তারা বলছে, ফুকুশিমার পর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে রিঅ্যাক্টর চালু করার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বিষয়টি আমার বোধগম্যতার বাইরে।’
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান