দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সামরিক আইন (মার্শাল ল) ঘোষণা করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার ইউন সুক ইওলকে একাধিক অভিযোগে দোষী ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—মার্শাল ল ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরে কর্তৃপক্ষকে বাধা দেওয়া, সরকারি নথি জাল করা এবং সামরিক আইন জারির ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা।
আজ শুক্রবার সিউলের সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে রায় ঘোষণার সময় বিচারক বেক দে-হিউন বলেন, ইউন সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। রায়ে বিচারক বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে অন্য সব দায়িত্বের ঊর্ধ্বে থেকে সংবিধান রক্ষা ও আইনের শাসন মেনে চলার যে দায়িত্ব তাঁর ছিল, অভিযুক্ত তার পরিবর্তে সংবিধানকে উপেক্ষা করার মনোভাব দেখিয়েছেন।’
বেক দে-হিউন আরও বলেন, ‘অভিযুক্তের অপরাধের মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর।’ আদালত জানান, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য ইউন সুক ইওলের হাতে সাত দিনের সময় রয়েছে। রায় ঘোষণার পরপরই আদালতের বাইরে ইউনের এক আইনজীবী ইউ জুং-হোয়া সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি, এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।’
এই রায়টি ইউন সুক ইওলের বিরুদ্ধে থাকা একাধিক ফৌজদারি মামলার মধ্যে প্রথম। তাঁর সামরিক আইন জারির চেষ্টা মাত্র প্রায় ৬ ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। তবে সেই ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
আল জাজিরার প্রতিবেদক জ্যাক বার্টন সিউল থেকে জানান, শুক্রবার রায় ঘোষণার সময় ইউনের সমর্থকেরা আদালতের বাইরে জড়ো হয়েছিলেন এবং রায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন। বার্টন বলেন, ‘এটা ভালো লক্ষণ নয়।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এখনো সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, বিদ্রোহের মামলা চলমান, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
বার্টন বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো মূল ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। মূল বিষয়টি হলো বিদ্রোহের বিচার, যা এখনো চলছে।’ বার্টন আরও বলেন, ‘এই মামলাগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হওয়াটা আবার সেই মূল বিদ্রোহ মামলাকে প্রভাবিত করছে। আমরা ফেব্রুয়ারিতে সেই মামলার রায় আশা করছি।’
এর আগে ইউন সুক ইওলকে অভিশংসন করা হয়, গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তাঁর স্বল্পমেয়াদি সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্তের পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যেখানে তাঁর পদত্যাগের দাবি ওঠে। তবে ইউন এখনো অনড় এবং দাবি করে আসছেন, তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেননি।
আদালতে তিনি যুক্তি দেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যেই সামরিক আইন ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, বিরোধী দলগুলোর কারণে সরকার পরিচালনার কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছিল—সেই বিষয়টি তুলে ধরতেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা ইয়ুনহাপ নিউজ শুক্রবার জানিয়েছে, ইউনকে যে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা বিশেষ কৌঁসুলি চো ইউন-সুকের নেতৃত্বাধীন আইনজীবী দলের দাবিকৃত শাস্তির অর্ধেক। ইয়ুনহাপ আরও জানায়, এই দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় ইউনের বিদ্রোহ মামলার রায়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সেই মামলার রায় আগামী মাসে হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহ মামলায় বিশেষ কৌঁসুলিরা চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ইউন সুক ইওলের জন্য মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন।