মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসা এবং ইরানের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘নোবিটেক্স’ (Nobitex) একই শিল্প নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে—এমন তথ্য সামনে এনেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সাল থেকে নোবিটেক্স অন্তত ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো লেনদেন করেছে ট্রন (Tron) ও বিএনবি চেইন (BNB Chain) নেটওয়ার্কে। এই দুই ব্লকচেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এর বড় সমর্থক।
সোমবার (১৮ মে) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রনের প্রতিষ্ঠাতা জাস্টিন সান এবং বিএনবি চেইনের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও (সিজেড) ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো উদ্যোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে সমর্থন দেন। একই সময়ে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপ এবং সংঘাত চললেও ইরানের ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ নোবিটেক্স এই দুই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিপুল অর্থ স্থানান্তর চালিয়ে গেছে।
তবে ট্রাম্প পরিবার নোবিটেক্স-এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানত—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও বিষয়টি স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, যাদের আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত প্রযুক্তির সঙ্গে তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সাবেক কর্মকর্তা জন রিড স্টার্ক বিষয়টিকে ‘নাটকীয় বিদ্রূপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রিপ্টো অর্থায়ন হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত গোষ্ঠীগুলোকেই প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চাইছেন।’
হোয়াইট হাউস অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র আনা কেলি রয়টার্সকে বলেছেন, ‘ট্রাম্পকে ইরানের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হাস্যকর।’ অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে নোবিটেক্সের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা মার্কিন আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা যায়—২০২৩ সালের পর থেকে ট্রন নেটওয়ার্কে ২ বিলিয়নের বেশি এবং বিএনবি চেইনে অন্তত ৩১৭ মিলিয়ন ডলারের লেনদেন করেছে নোবিটেক্স। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-সংঘাতের সময়েও এই লেনদেন অব্যাহত ছিল।
এর আগে রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, নোবিটেক্স ইরানের প্রভাবশালী এক পরিবারের দুই ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং এটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। নোবিটেক্স ব্যবহারকারীদের মধ্যে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মতো সংস্থাও রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
ক্রিপ্টো বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কারণ নোবিটেক্স নিয়মিত ওয়ালেট ঠিকানা পরিবর্তন করে, যাতে লেনদেন শনাক্ত করা কঠিন হয়।
বিএনবি চেইন কর্তৃপক্ষ রয়টার্সকে জানিয়েছে, এটি একটি ‘স্বাধীন ও উন্মুক্ত’ ব্লকচেইন এবং বিন্যান্স সরাসরি এটি নিয়ন্ত্রণ করে না। তবে আবুধাবির করপোরেট নথিতে দেখা গেছে, বিএনবি চেইন টেকনোলজি হোল্ডিংসের একমাত্র শেয়ারহোল্ডার এখনো চ্যাংপেং ঝাও।
অন্যদিকে ট্রনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কেবল প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং প্রতিটি লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে তারা শত শত মিলিয়ন ডলার জব্দ করেছে বলে দাবি করা হয়।
২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তার পরিবার একাধিক ক্রিপ্টো ব্যবসা চালু করে। জাস্টিন সান ওয়ার্ল্ড লিবার্টির টোকেনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন। একই সময়ে আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এমজিএক্স বিন্যান্সে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে, যার লেনদেনে ব্যবহৃত হয় ওয়ার্ল্ড লিবার্টির স্টেবলকয়েন ‘ইউএসডি১’।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর ক্রিপ্টো খাতের প্রতি ইতিবাচক নীতি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্রিপ্টো কোম্পানির বিরুদ্ধে কিছু তদন্ত স্থগিতও করেছে। সমালোচকেরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসাকে সরাসরি লাভবান করতে পারে।