বিশ্ববাজারে চাহিদার ধীরগতি ও দেশের অর্থনীতিতে নানা চাপের মধ্যেও রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) দেশের তৈরি পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাবদ আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
আজ বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। এ ছাড়া তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ভারত, জাপানের বাজারও ভূমিকা রেখেছে।
ইপিবি বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ধরে রাখার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বাণিজ্য সহজীকরণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে সংস্থাটি।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আয় হয়েছিল ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার ডলারের। গত বছরের একই মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ২৮৩ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এতে এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
তৈরি পোশাকের মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি প্রথম প্রান্তিকে বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫৯৬ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৫৫৮ কোটি ডলার। আর ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৪৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩৯ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার।
তৈরি পোশাকের বাইরে কয়েকটি প্রধান রপ্তানি খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ।
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বরে বেড়েছে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
হালকা প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি প্রথম প্রান্তিকে বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। একই সময়ে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ওষুধ রপ্তানিতে। প্রথম প্রান্তিকে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর সেপ্টেম্বর মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
তবে কৃষিপণ্য এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এসব খাতে রপ্তানি কমলেও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনকারী খাতের ভালো পারফরম্যান্সের কারণে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ২৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২৩২ কোটি ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাজ্য। দেশটিতে প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি হয়েছে ১৩৭ কোটি ২ লাখ ডলারের পণ্য। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ১২১ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য।
উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যেও কয়েকটিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে রপ্তানি ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ২১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে তুরস্কে রপ্তানি হয়েছিল ১০ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার।
এ ছাড়া ভারত ও জাপানও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে ভারত ষষ্ঠ এবং জাপান নবম অবস্থানে রয়েছে। দুই দেশেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।