হোম > অর্থনীতি

সিএসআর ব্যয়: সব প্রধান খাতেই বড় পতন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের ব্যাংক খাতে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ব্যয়ের প্রায় সব প্রধান খাতেই বড় ধরনের পতন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন-অভিযোজন খাতে, ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএসআর কার্যক্রমের ষাণ্মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, জানুয়ারি-জুন সময়ে পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে ব্যয় ছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে এ খাতে ব্যয় কমেছে ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। শিক্ষা খাতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। আগের ষাণ্মাসিকে এ খাতে ব্যয় ছিল ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ফলে কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় কমেছে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। জানুয়ারি-জুনে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আগের ষাণ্মাসিকে ব্যয় ছিল ৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

তবে অন্যান্য খাতে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এসব খাতে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আগের ষাণ্মাসিকে যা ছিল ৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৩.৭ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ১১৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। আগের ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর এ ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে ব্যাংকের সিএসআর ব্যয় কমেছে ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারে না। নিয়ম অনুযায়ী একটি ব্যাংক ১০০ টাকা সিএসআর ব্যয় করলে তার মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ করে মোট ৬০ শতাংশ; পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ২০ শতাংশ এবং আয়-উৎসারী কাজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া, সংস্কৃতিসহ অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ খরচ করতে পারে।

ব্যাংকের ধরনভেদেও সিএসআর ব্যয়ে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। দেশের ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩৩টি ব্যাংক সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ব্যাংকিং খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৮৭ দশমিক ১১ শতাংশই এসেছে এসব ব্যাংক থেকে। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ শ্রেণির ৯টি ব্যাংকের মধ্যে ৬টি সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে দুটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। বিশেষায়িত তিন ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংক ব্যয় করেছে ১১ লাখ টাকা।

খাতভিত্তিক ব্যয়েও পরিবর্তন এসেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাংকগুলো ব্যয় করেছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৯ দশমিক ১১ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয় হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গেছে ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য উপখাতে ৫ কোটি ৮৩ লাখ, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ২ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধিই সিএসআর ব্যয় কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকের মুনাফায়ও চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে সিএসআর ব্যয়ে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা ব্যাংক। জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটি ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যয় ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক ১০ কোটি ৫০ লাখ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৮ কোটি ৯২ লাখ, পূবালী ব্যাংক ৮ কোটি ৬৭ লাখ, ট্রাস্ট ব্যাংক ৮ কোটি ৪৩ লাখ, যমুনা ব্যাংক ৮ কোটি ৭ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংক ৭ কোটি ৪১ লাখ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৬ কোটি ৩৮ লাখ এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে।