হোম > অর্থনীতি

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমাল আইএমএফ, মূলে জ্বালানি ও ব্যাংক খাতে সংকট

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। অব্যাহত অর্থনৈতিক সংকট ও নানামুখী অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পর এবার আন্তর্জাতিক এই সংস্থাও তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করল।

চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন চলাকালে আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই নতুন প্রাক্কলন তুলে ধরা হয়। আইএমএফের নতুন এই হিসাব বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক পূর্বাভাসের চেয়েও কম।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তাদের পূর্বাভাসে বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এপ্রিলে অনুমান করা হয়েছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, এডিবি গত সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে কেবল প্রবৃদ্ধির হার কমার কথা বলা হয়নি, বরং দেশের মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর আগের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১০ শতাংশ।

ঋণদাতা সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং তার আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, অঞ্চলটিতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ৪ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির শীর্ষে রয়েছে ভারত। এর পরেই ভুটানের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

সংস্থাটির মতে, মালদ্বীপে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ (মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ (মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ ও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ) হতে পারে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি (১০ দশমিক ৯ শতাংশ) ও সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি (৩ দশমিক ২ শতাংশ) নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পেছনের সারিতে অবস্থান করছে।

কেন কমছে অর্থনৈতিক গতি?

বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশ টানা চতুর্থ বছরের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমার ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক এই গতিহ্রাসের পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপ্রতুলতার কারণে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা: আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের চাপ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ঋণ প্রবাহে স্থবিরতা: ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৫ শতাংশে (জুন ২০২৬) নেমে এসেছে।

সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস: কঠোর রাজস্ব সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে সরকারি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর পর থেকে প্রতি বছরই তা ধারাবাহিকভাবে কমছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি, যার ফলে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বারবার কমাতে বাধ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।