লাইটারেজ জাহাজের তীব্র সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে ৪৫ লাখ টন পণ্য নিয়ে সাগরে ভাসছে শতাধিক বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল)। পণ্য খালাস করতে না পেরে প্রতিদিন মাশুল গুনছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ছয়টি জাহাজ ভোগ্যপণ্য নিয়ে বন্দরে ভিড়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দুটি গমবোঝাই জাহাজ। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় ধরনের জাহাজ জট তৈরি হয়েছে।
লাইটারেজ সংকটে পণ্য খালাসে অচলাবস্থার কথা স্বীকার করেছেন বন্দরের পরিচালক ওমর ফারুক। তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে বন্দরে ৩০-৩৫টি বড় জাহাজ অপেক্ষমাণ থাকে। গত কয়েক দিন ৭০-৮০টি জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে। লাইটারেজ জাহাজের তীব্র সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বন্দর কর্মকর্তা, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর ও আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহির্নোঙরে জাহাজ জট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে শতাধিক মাদার ভেসেল সাগরে অপেক্ষায় রয়েছে, অথচ দৈনিক খালাস সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় নেমে এসেছে অনেক নিচে।
বন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে বুধবার ১০৮টি কার্গো জাহাজ অবস্থান করছিল। এসব জাহাজে মোট ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি জাহাজে সাধারণ পণ্য, রমজানের জন্য আমদানি করা খাদ্যপণ্যসহ ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, মসুর ডাল ও ভোজ্যতেল রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি জাহাজে ২ লাখ টনের বেশি চিনি, সাতটি জাহাজে সার এবং ২৫টি জাহাজে সিমেন্ট ক্লিঙ্কার রয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, বন্দরে প্রতিদিন ৩০০টি লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন হয়। চাহিদার বিপরীতে প্রয়োজনীয় লাইটারেজ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গত মঙ্গলবার ৯০টি মাদার ভেসেলের জন্য ১০৪টি লাইটারেজ জাহাজের চাহিদা ছিল। কিন্তু সরবরাহ করা গেছে মাত্র ৫৯টি।
লাইটারেজ জাহাজের সিরিয়াল দেয় বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৩৫০টি লাইটারেজের চাহিদার বিপরীতে ৮০টি লাইটারেজ জাহাজ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে বলে জানান বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ।
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস সূত্র জানায়, সাধারণ সময়ে একটি মাদার ভেসেল প্রায় ৫০ হাজার টন পণ্য নিয়ে বন্দরে এলে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস শেষ করে চলে যায়। কিন্তু বর্তমানে লাইটারেজ সংকটের কারণে সেই সময়সীমা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। অনেক জাহাজকে ২০-৩০ দিন বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আর কিছু জাহাজ কয়েক দিন ধরে এক টন পণ্যও খালাস করতে পারছে না।
নাবিল গ্রুপের প্রতিনিধি সাইফুল আলম বাদশা বলেন, ‘লাইটারেজ জাহাজ না পাওয়ায় অধিকাংশ সময় খালাস বন্ধ থাকে। প্রতিদিন আমাদের ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। এর চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তা ও অর্থনীতির ওপর পড়বে।’
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ১২০০ লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২৫০-৩০০টি লাইটারেজ জাহাজ মোংলা বন্দরে চলে গেছে। এ ছাড়া পায়রা বন্দরেও কিছু জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে চলে গেছে।
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের এই কর্মকর্তারা জানান, একাধিক কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঘন কুয়াশার কারণে নদীপথে চলাচল ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে ৪১টি ঘাটে ৬৩১টি লাইটারেজ জাহাজ আটকে আছে। এর মধ্যে ১০৪টি জাহাজ সরকারি সার পরিবহনে নিয়োজিত।
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএইচবিওএ) সভাপতি সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, ‘জাহাজ আসছে দ্রুত, কিন্তু পণ্য খালাস করতে পারছি না। প্রতিদিন স্বাভাবিক পণ্যপ্রবাহ বজায় রাখতে যেখানে ২০০-৩০০ লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০-৪০টি। এতে খালাস কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।’