হোম > অর্থনীতি

নিত্যপণ্যের বাজারে সিটির দাপট কমছে

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা

ফাইল ছবি

দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে যে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী বছরের পর বছর সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, তাদের মধ্যে সিটি গ্রুপের অবস্থান ছিল শীর্ষে। চিনি, ভোজ্যতেল, আটা-ময়দা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে বড় আমদানিকারক ও উৎপাদক হিসেবে বাজারে তাদের উপস্থিতি ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু সেই অবস্থানে এখন টান পড়েছে। আমদানি কমেছে, শীর্ষ আমদানিকারকদের তালিকায় অবস্থান নেমেছে এবং একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি বেড়েছে। ফলে এটি শুধু একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমে যাওয়ার গল্প নয়; দেশের নিত্যপণ্যের সরবরাহ কাঠামোতেও ভারসাম্যের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিনি, পাম তেল, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, সয়াবিন, গম, ডালসহ প্রধান নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে সিটি গ্রুপের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই ব্যয় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারকদের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় স্থান থেকে চতুর্থ অবস্থানে নেমে এসেছে।

বর্তমান অবস্থার সঙ্গে আগের হিসাব মিলিয়ে দেখলে পরিবর্তনের মাত্রা স্পষ্ট হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিটি গ্রুপের আমদানি ব্যয় ছিল ১২৯ কোটি মার্কিন ডলার। তার আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে সাড়ে ২১ লাখ টন পণ্য আমদানিতে শুল্ক-করসহ ব্যয় হয়েছিল ১৬৬ কোটি ডলার। তখন ব্যয়ের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ছিল তৃতীয়। দুই বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয়ের এই বড় পতন সিটি গ্রুপের ব্যবসার পরিসরে নিম্নমুখী অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অন্যদের জায়গা বাড়ছে: এদিকে সিটির আমদানি কমার সময় বাজারে জায়গা তৈরি হয়েছে অন্যদের জন্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় ১৫১ কোটি ডলারের নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। একই সময় টি কে গ্রুপের আমদানি ছিল প্রায় ৭৯ কোটি ডলার। স্মাইল ফুডও শীর্ষ আমদানিকারকদের তালিকায় উঠে এসেছে। ডেলটা অ্যাগ্রোফুড এক বছরের ব্যবধানে ১৩তম স্থান থেকে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে।

ভোজ্যতেলের বাজারেও একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের তথ্য অনুযায়ী, ভোজ্যতেল আমদানির প্রায় ৯১ শতাংশ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের হাতে। সেখানে সিটি গ্রুপের অংশ প্রায় ১৩ শতাংশ; অথচ এর বিপরীতে টি কে গ্রুপের অংশ প্রায় ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ যে বাজারে সিটির বড় উপস্থিতি ছিল, সেখানে তাদের অবস্থানের অবনতি হয়েছে এবং প্রতিযোগীদের অবস্থান এখন আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

কেন পিছিয়ে সিটি: সিটি গ্রুপের দাবি, এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিনিয়োগ এবং এর ফলে তৈরি হওয়া চলতি মূলধনের ওপর চাপ। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার হোসেন্দি ইকোনমিক জোনে সিমেন্ট, এলপিজি, কেমিক্যাল, লবণ, কাগজ ও চিনি-সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। কিন্তু সেখানে সময়মতো গ্যাস-সংযোগ না পাওয়ায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ছয়টি প্রকল্প আজও চালু করা যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রুপটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মসিহুল হক চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রকল্পগুলো চালু না হলেও সুদ, বেতন, স্থায়ী ব্যয়সহ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। গ্যাস অবকাঠামোর জন্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নিরাপত্তা জামানত ও নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগের টাকা আটকে আছে, কিন্তু সেখান থেকে উৎপাদন বা নগদ আয় আসছে না।

করপোরেট অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ‘ফান্ড মিসম্যাচ’। সহজ করে বললে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে টাকা আটকে থাকায় প্রতিদিনের ব্যবসা চালানোর জন্য যে নগদ অর্থ দরকার, সেটিতে টান পড়েছে। আর সিটি গ্রুপের ব্যবসার বড় অংশ যেহেতু আমদানিনির্ভর, তাই এই চাপের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে এলসি খোলায়।

এলসি কমেছে, আমদানিও: নিত্যপণ্যের ব্যবসায় কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হলে তার প্রভাব দ্রুত পড়ে উৎপাদন ও বাজার সরবরাহে। সিটি গ্রুপের ভাষ্য, চলতি মূলধনের সংকটে নতুন এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এলসি না খুললে কাঁচামাল আসবে না, উৎপাদনও স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে না। ফলে আমদানি কমার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ—দুই দিকেই চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকছে।

এখানেই সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতির বড় দায়। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি কমে যাওয়া মানে বাজারে তার জায়গা অন্যরা নিচ্ছে—এটি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার অংশ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বাজার অংশ যদি দীর্ঘ সময় ধরে বড় থাকে, তাহলে সরবরাহের ভারসাম্য বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে আমদানির উৎস, উৎপাদনক্ষমতা এবং পণ্যের বাজারদরেও প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা।

৩৬ ব্যাংকের নজর: অন্যদিকে সিটি গ্রুপের ঋণদাতা ৩৬টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন যৌথভাবে গ্রুপটির আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করছে। তাদের ঋণ, ব্যবসার সক্ষমতা এবং পরিশোধের সামর্থ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের কাজও করছে। ব্যাংকগুলোর আলোচনায় চলতি মূলধন জোগান এবং এলসি সুবিধা আবার চালুর বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সিটি গ্রুপের দাবি, ব্যাংকগুলোতে তাদের মূল বকেয়া ছিল প্রায় ২২ থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা। নতুন ঋণ না নেওয়া এবং কিছু অর্থ পরিশোধের পরও শুধু সুদ যোগ হয়ে গত সেপ্টেম্বর মাসের চূড়ান্ত হিসাব শেষে এই দায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সিটি গ্রুপের সঙ্গে এখন আলোচনা ও নথি পর্যালোচনা চলছে। এটি দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। তবে বর্তমানে তাদের ঋণগুলো পুনঃ তফসিল এবং পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। সেটি দ্রুতই হয়ে যাবে বলে আশা করছি। অন্যরাও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করছে। সেই সঙ্গে গ্রুপটিকে এলসি খোলার জন্য চলতি মূলধনের জোগানের বিষয়টি নিয়েও ব্যাংকগুলো কাজ করছে।’