অর্থনীতির ধীরগতির কারণে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়ছে। কমছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। এমন পরিস্থিতিতে গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান ও ধ্রুব শর্মা।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।
সংস্থাটির পূর্বাভাস, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ও সংস্কারে গতি এলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ২ শতাংশে, যা করোনার পর কোনো প্রান্তিকে সর্বনিম্ন।
প্রবৃদ্ধির ধীরগতির বড় কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়া। গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানিও কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বড় প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতায় উন্নয়ন ব্যয়ও কমেছে।
শিল্প খাতে এর প্রভাব পড়েছে। গত অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে।
দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। জাতীয় দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য তা যথেষ্ট হবে না।
উচ্চ মূল্যস্ফীতিও মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থাকলেও গত অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সমস্যায় মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বেশি। কম আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি আগস্টে আবার ঋণাত্মক হয়েছে।
অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এ হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অথচ ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক হার ১০ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা ২০২৬ সালের জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকার বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণের সুযোগ কমবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে আছে। সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির ১১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। বাজেট ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। গত অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দেশে পৌঁছেছে। বিপরীতে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও এর বড় অংশ প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
সংস্থাটির হিসাবে, খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং নগদ সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব। এ জন্য ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার পাশাপাশি আরও বেশি এবং ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে।