হোম > অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতির শঙ্কায় অধিক সতর্কতা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

প্রতীকী ছবি

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু স্বস্তির জায়গায় এখনো পৌঁছায়নি; বরং জ্বালানি তেলের দাম বাড়া, নতুন পে-স্কেল চালুর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে। এ কারণে কমতির দিকে থাকা মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যতে আবার ঊর্ধ্বগতিতে ইউটার্ন নেওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না নীতিনির্ধারকেরা। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খলা চেইন এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিক পর্যবেক্ষণে। সেই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো বিগত সময়ের ছয় মাসের মুদ্রানীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে প্রবেশ করেছে দেশ। নতুন মুদ্রানীতির পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্যন্ত।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রথমবার ত্রৈমাসিক এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। এতে অর্থনীতির বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো উঠে এসেছে। সেই অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থনীতি পরিচালনার কৌশলও ঠিক করতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এ সময় ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। যেখানে ব্যাংকগুলোর জরুরি তারল্য সহায়তার সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং আমানত গ্রহণের সুদহার স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখার সুপারিশ এসেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমপিসির সেই সুপারিশ ও সিদ্ধান্তই ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, অর্থনীতির সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আগামী অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে মুদ্রানীতির কার্যকারিতার ক্ষেত্রে সুদহার না বাড়িয়ে, না কমিয়ে আপাতত পরিস্থিতি খুব সতর্কভাবে দেখার পথেই থাকছে বাংলাদেশ ব্যাংক; যা তুলে ধরা হয়েছে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের বার্তায়।

এর আগে গত ৩১ জুলাই ২১ মাস পর নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য ছিল বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো। কিন্তু পরে দেখা যায়, কমানোর পরও বেসরকারি ঋণের চাহিদায় উল্লেখযোগ্য সাড়া মেলেনি। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর পরও যেহেতু বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আশানুরূপ জোরদার হয়নি; তাই বুঝতে হবে, অর্থনীতিতে এখনো বৈশ্বিক ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির প্রকোপ পুরোপুরি দূর হয়নি, বরং পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে। এই পরিস্থিতিতে এখন নতুন করে নীতি সুদহার কমানোর কার্যকারিতা বাড়বে না। আবার নীতি সুদহার বাড়ালেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে। সে কারণেই অর্থনীতির আচরণকে গভীরভাবে বোঝার জন্য আগামী তিন মাস পর্যবেক্ষণে রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমে এলেও তার প্রভাব টেকসই হচ্ছে না। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়ে গেছে। ফলে দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কাটেনি। এই অবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দামের অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বাণিজ্য বিঘ্ন, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দামের সমন্বয় এবং নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য প্রভাবকে ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনায় রাখতেই হচ্ছে।

জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও এমপিসির সদস্য ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে নীতিনির্ধারকেরা আপাতত অপেক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের অবস্থান নিয়েছেন। এতে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বর্তমান নীতির প্রভাব বোঝা যাবে।

তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানি তেলের দাম ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।