হোম > অর্থনীতি

উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি ঋণ: প্রকল্পজটে ৬১% কমেছে ঋণছাড়

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

দেশীয় অর্থে সামর্থ্যের ঘাটতির কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নেওয়া বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পেই রয়েছে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা। কিন্তু সেসব প্রকল্পের বিপরীতে দেওয়া প্রতিশ্রুত অর্থ এমনি এমনি আসে না। চুক্তি, প্রকল্প প্রস্তুতি, দরপত্র, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ঋণদাতার বিভিন্ন শর্ত পূরণ—প্রতিটি ধাপ পেরোনোর প্রক্রিয়া সন্তোষজনক হলেই প্রয়োজনীয় অর্থছাড় মেলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুকূলে। সেখানেই বড় রকমের পিছিয়ে দেশ। চুক্তির পর দরপত্র দিতেই পেরিয়ে যায় দীর্ঘ সময়। আবার বাস্তবায়ন পর্যায়ে গেলেও সেখানে ধীরগতি যেন অবধারিত, যা বিদেশি ঋণের প্রকল্পে অহেতুক জট তৈরি করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর এ অক্ষমতার খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ।

বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে গতি প্রত্যাশিত না হওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থছাড়ে মনোযোগী হচ্ছে না। এতে একদিকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার হার কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে আগে চুক্তিবদ্ধ বা পাইপলাইনে থাকা প্রতিশ্রুত ঋণছাড়ের হারও উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক অর্থছাড় এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৬১ শতাংশ। আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো পুরোনো ঋণ সুদ-আসলে পরিশোধের চাপ এই সময় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জুলাই-আগস্টের বৈদেশিক সহায়তা-সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনার সাময়িক হিসাব পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনটি গতকাল রোববার প্রকাশ করা হয়।

ইআরডির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বিদেশি সহায়তার প্রকল্পে অর্থছাড় হয়েছে মাত্র ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ দুই মাসে অর্থছাড় কমেছে ৪৫ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এর বড় অংশই ঋণ। এ সময়ে ঋণ হিসেবে ছাড় হয়েছে ২৯ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৪ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অনুদানও কমেছে—৩৯ লাখ ১০ হাজার ডলার থেকে নেমে এসেছে ৩১ লাখ ৯০ হাজার ডলারে।

অর্থনীতিবিদেরা জানিয়েছেন, কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু বা অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের সুযোগও তৈরি হয় না। জমি অধিগ্রহণ, নকশা, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ঋণদাতার শর্ত পূরণে দেরি হলে অর্থছাড়ও পিছিয়ে যায়।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন দেশে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। জুলাই-আগস্টে নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৪ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। এর মধ্যে ঋণের প্রতিশ্রুতি আগের ১৭ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার থেকে কমে হয়েছে ১৪ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। বিপরীতে অনুদানের প্রতিশ্রুতি ৭ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার।

দুই মাসে ছাড়কৃত অর্থের মধ্যে এডিবি দিয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ, আইডিএ ৭ কোটি ৪০ লাখ, জাপান ৩ কোটি ৯ লাখ, ভারত ৩ কোটি ৩ লাখ এবং রাশিয়া ২ কোটি ৭ লাখ ডলার। অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে মাত্র ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এ সময়ে এআইআইবি ও চীন থেকে কোনো অর্থছাড় হয়নি।

অন্যদিকে পুরোনো ঋণের শোধের চাপ ঠিকই বাড়ছে। জুলাই-আগস্টে মূল ঋণ ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ শোধ বেড়েছে ৩ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

এর মধ্যে আসল পরিশোধ হয়েছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার, আগের বছর ছিল ৪৮ কোটি ৮৭ লাখ ৯০ হাজার। সুদ পরিশোধ হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার, আগের বছর ছিল ১৭ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার ডলার।