বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ কাউন্টার খুলে গ্রাহক পর্যায়ে নতুন নোট দেওয়া বন্ধ করলেও ব্যাংকগুলোর চাহিদা মতো টাকা সরবরাহ করছে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইস্যু করা জুলাই গ্রাফিতিসহ নতুন ডিজাইনের নোট দেওয়া হচ্ছে বেশি। পুরোনো ডিজাইনের নোটও যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর কাছে। কিন্তু অনেক ব্যাংকের শাখায় গ্রাহকেরা নতুন নোট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে ঈদ সামনে রেখে ফুটপাতে পর্যাপ্ত নোট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। এই নোট তাদের হাতে কীভাবে আসছে তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। চাহিদা মেটাতে অনেকেই মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কিংবা রাজধানীর গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে চড়া দরে নতুন নোট কিনছেন। ১০০টি নোটের একটি বান্ডিলে ১৫০ থেকে ৪৫০ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে।
প্রতিবছর ঈদের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিলসহ বিভিন্ন শাখা অফিস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভিন্ন শাখায় বিশেষ কাউন্টার খুলে নতুন নোট বিনিময় করা যেত। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ বিনিময়, সঞ্চয়পত্র বিক্রি, প্রাইজবন্ড বিক্রিসহ গ্রাহক পর্যায়ের সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গ্রেড অনুযায়ী নতুন টাকার চাহিদা মতো নতুন নোট সরবরাহ করলেও গ্রাহক পর্যায়ে নতুন নোট দেওয়া বন্ধ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিটি ব্যাংকের চলতি হিসাব থাকে। সেসব হিসাবে টাকা জমা ও উত্তোলন ব্যাংকগুলোর নিয়মিত কাজ। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যাংকগুলোর নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময়ে রি-ইস্যু করা নতুন ছাপানো নোট প্রচুর ছাড়া হয়। ছেঁড়াফাটা, অতি দাগসহ বিভিন্ন কারণে যেসব নোট প্রচলনে দেওয়ার মতো থাকে না, তার বিপরীতে ছাপানো এসব নোট বাজারে আসে। আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ কাউন্টারের মাধ্যমে নতুন টাকা দেওয়া হতো। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা তদারকি করত। এখন ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো করে টাকা নিয়ে বিতরণ করছে।
ভুক্তভোগীদের অনেকের অভিযোগ, তদারকি না থাকায় ব্যাংকাররা নিজেদের পছন্দের গ্রাহককে নতুন নোট দিচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন করপোরেট গ্রাহক, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনদের মধ্যে এসব নোট বিতরণ করা হচ্ছে। যে কারণে সাধারণ কেউ অধিকাংশ ব্যাংক শাখায় গিয়ে নতুন নোট পাচ্ছেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শাখা থেকে বলা হচ্ছে, নতুন নোট বিনিময় হচ্ছে না।
কানিজ ফাতিমা নামের একজন গ্রাহক বলেন, সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় নতুন টাকার জন্য গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে কোনো টাকা পাননি। পরে অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায়ও যান। কিন্তু সেখানেও নতুন নোট পাননি। পরে একজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে দুটো ৫০ টাকার বান্ডিল সংগ্রহ করেন।
এদিকে রাজধানীতে মতিঝিল কিংবা গুলিস্তানে ফুটপাতে পর্যাপ্ত নোট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতে নতুন নোট বেচাকেনা হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ফুটপাত থেকে নতুন নোট কিনতে গিয়ে ১৫০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে নতুন ডিজাইনের নোট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণভাবে নতুন ডিজাইন প্রণয়নের পর বাজারে ছাড়তে ১৫ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। নতুন ডিজাইনের মধ্যে ২০০, ১০ ও ৫ টাকা- এই তিন ধরনের নোটে স্থান পায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের আঁকা গ্রাফিতি। এ ছাড়া সব নোটেই ‘বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য’র বিভিন্ন নিদর্শনকে স্থান দেওয়া হয়।
জানা গেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন ডিজাইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত এই ডিজাইনের নোট ছাপা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোটও বাজারে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি নোটের ডিজাইন ঠিক করতে কয়েকটি বৈঠক করা হয়। ডিজাইন ঠিক করার পর প্রিন্টিংয়ের জন্য প্লেট তৈরি হয়। এরপর নিলাম প্রক্রিয়ায় কাগজ ও কালি আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে কাগজে জলছাপের ছবি কী হবে এবং কোথায় নিরাপত্তা সুতা বা অন্য ফিচার থাকবে তা ঠিক করে দিতে হয়। সাধারণভাবে দেশের বাইরে থেকে এসব কাগজ আমদানি হয়। নির্ধারিত ডিজাইন অনুযায়ী কাগজ প্রস্তুত করে পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া হয়।