হোম > অর্থনীতি

নিট ঋণ বাড়ল ১৩ হাজার কোটি

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা

সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের জোগানে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে বাজেটের আয়-ব্যয়ের হিসাবে বড় ধরনের চাপ দেখা দেয়, সময়ের সঙ্গে যা আরও স্পষ্ট হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় না বাড়া এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থছাড় কমে যাওয়ায় সরকারি ব্যয়ের চাহিদা মেটাতে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি ব্যাংকঋণে। অর্থবছরের মাত্র দুই মাসেই সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়েছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ গুণের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের বাণিজ্যিক ব্যাংকঋণ বেড়েছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ।

তবে একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছে সরকার। জুলাই-আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এই সময়ে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। প্রথম দুই মাসেই নিট ঋণ নেওয়া হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে নতুন ঋণ নেওয়ার বদলে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নেওয়া অর্থ পরিশোধ করেছিল। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরুতে ঋণ বৃদ্ধির এই প্রবণতা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ার পেছনে রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। ভ্যাট জমার নিয়মে পরিবর্তনও রাজস্ব প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে। আগে মাসিক জমার নিয়ম থাকলেও পরে তিন মাস পরপর জমার সুযোগ দেওয়া হয়। এখন আবার মাসভিত্তিক ভ্যাট জমার নিয়ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে একদিকে বেসরকারি খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাবে না, অন্যদিকে বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ড. মো. এজাজুল ইসলাম মহাপরিচালক বিআইবিএম

অন্যদিকে রাজস্ব আদায় কমলেও সরকারি ব্যয় কমেনি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো, জ্বালানি খাতের ব্যয় ও ভর্তুকি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে তুলনামূলক বেশি তারল্য রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ব্যাংকাররা বলছেন, আপাতত সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে না। তবে সরকারি ঋণের সুদের হার কমে যাওয়ায় ব্যাংকের আয় কমছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ঋণের সুদহার আমানতের সুদহারের নিচেও নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। গত জুন শেষে যা ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি জুনের ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা থেকে কমে আগস্টে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকায় নেমেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, মূলত তিন কারণে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে। প্রথমত, সরকারের ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় আয় আসছে না। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চ মূল্যে জ্বালানি তেল, সারসহ অন্যান্য পণ্য কিনতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি বেতন-ভাতা এবং কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিভিন্ন প্রণোদনায় বড় ব্যয় করতে হচ্ছে।

এজাজুল ইসলাম বলেন, এখনই কোনো সংকট তৈরি না হলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে একদিকে বেসরকারি খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাবে না, অন্যদিকে বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।