হোম > অর্থনীতি

জাতীয় বন্দর কৌশল: ঋণের কিস্তি পরিশোধেই যাবে আয়ের পাঁচ গুণ

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 

ফাইল ছবি

দেশের স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হলেও আয় ও মুনাফার বড় অংশ আসছে মাত্র কয়েকটি বন্দর থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচালনাধীন ১৬টি স্থলবন্দরের রাজস্বের (ট্যারিফ) প্রায় ৭৮ শতাংশ এসেছে চারটি বন্দর থেকে। এই চার বন্দরের অবদান মোট মুনাফার প্রায় ৭৪ শতাংশ।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ শুরু হলে ২০২৮ সালের পর বার্ষিক কিস্তির পরিমাণ বর্তমান নিট আয়ের প্রায় পাঁচ গুণ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় বন্দর কৌশলের স্থল বন্দরবিষয়ক খসড়ায় উঠে এসেছে এ চিত্র।

খসড়া কৌশলে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সব স্থলবন্দরে একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ না করে পণ্য ও যাত্রী চলাচল, প্রকৃত চাহিদা এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বিনিয়োগ করতে হবে। বড় প্রকল্প একবারে বাস্তবায়নের বদলে ধাপে ধাপে অবকাঠামো নির্মাণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। কারণ, চাহিদা না বাড়লে নতুন স্থাপনা অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারে, অথচ ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়বে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির অধীনে বাস্তবায়নাধীন তিনটি প্রধান উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৬৭২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এসব প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণসহায়তা রয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের স্থলবন্দরগুলো দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টন পণ্য ও ১৮ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী চলাচল করেছে। পণ্য পরিবহনের প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানি। পণ্য পরিবহনে শীর্ষে সোনামসজিদ, এরপর বুড়িমারী, বেনাপোল, ভোমরা ও বাংলাবান্ধা। যাত্রী চলাচলে শীর্ষে বেনাপোল, এরপর ভোমরা, আখাউড়া, হিলি ও বুড়িমারী।

তবে বন্দরের আয় ও মুনাফার বড় অংশ কয়েকটির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে কোন বন্দরে কী ধরনের পণ্য কত পরিমাণে যাচ্ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ, অবকাঠামো পরিকল্পনা ও প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে খসড়া কৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চার বন্দরে রাজস্বের ৭৮ শতাংশ

জাতীয় বন্দর কৌশলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচালনাধীন ১৬টি স্থলবন্দরের মধ্যে বেনাপোল, বুড়িমারী, ভোমরা ও তামাবিল থেকে এসেছে মোট ট্যারিফ রাজস্বের প্রায় ৭৮ শতাংশ। এই চার বন্দরের অবদান মোট মুনাফার প্রায় ৭৪ শতাংশ।

খসড়া কৌশলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে একটি প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা বেনাপোল, ভোমরা ও বুড়িমারী বন্দরের বর্তমান বার্ষিক মোট মুনাফার প্রায় ৪৫ বছরের সমপরিমাণ। তবে বন্দরের উন্নয়ন শুধু আর্থিক মুনাফার ভিত্তিতে বিবেচনা করা যাবে না। কোনো প্রকল্প সরাসরি লাভজনক না হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা ও ব্যয়ের যথাযথ বিশ্লেষণ জরুরি।

স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, জিওবি ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান একটি প্রকল্পে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

ঋণ পরিশোধ ও অবকাঠামো ব্যবহারে শঙ্কা

বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ ভবিষ্যতে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। জাতীয় বন্দর কৌশলের হিসাবে, ২০২৮ সালের পর বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বর্তমান বার্ষিক নিট আয়ের প্রায় পাঁচ গুণ হতে পারে। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানো, আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

স্থলবন্দর ও স্থল কাস্টমস স্টেশনের (এলসিএস) পার্থক্য তুলে ধরে খসড়া কৌশলে বলা হয়েছে, সীমান্তে অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী অবকাঠামো ছাড়াই দুই দেশের ট্রাকের মধ্যে পণ্য স্থানান্তর করা যায়। ফলে বন্দরের শেড, গুদাম বা যান্ত্রিক সুবিধা সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না। এসব সুবিধা নিতে অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয় বলে আশপাশের এলসিএস দিয়ে কাজ চালানোর সুযোগ থাকলে ব্যবসায়ীরা বন্দরে যেতে আগ্রহী হন না। এতে বন্দরের আয় ও বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা কমতে পারে।

জনবল, নিরাপত্তা ও ট্রাকের সক্ষমতা

দেশের ব্যস্ততম স্থলবন্দর বেনাপোলে চালক ও শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় জনবল ঘাটতির বিষয়টি চিহ্নিত করেছে খসড়া কৌশল। এতে বিরোধ, বিশৃঙ্খলা ও চোরাচালানের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিরাপত্তা জোরদারে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি, কার্গো এক্স-রে স্ক্যানিং ও পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করা হয়েছে। বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনায় দ্রুত ছাড়পত্র, সুরক্ষাসামগ্রী, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশি ট্রাকের ধারণক্ষমতা ৬ থেকে ৩০ টন, আর ভারতীয় ট্রাকের ৬ থেকে ৮০ টন। খসড়া কৌশলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি ভারতীয় ট্রাকের সমপরিমাণ পণ্য পরিবহনে গড়ে দুটির বেশি বাংলাদেশি ট্রাক প্রয়োজন হতে পারে। এতে সীমান্তে পণ্য স্থানান্তর, অপেক্ষা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। ভবিষ্যতে বিবিআইএন মোটরযান চুক্তি বাস্তবায়নেও এ পার্থক্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বন্দর কৌশলের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ২০২৮ সালের পর ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপ বাড়লেও সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করবে। বন্দরের আয় কম হলে নিজস্ব তহবিল থেকে কিস্তি পরিশোধ করা হবে, প্রয়োজনে সরকার অর্থ দেবে। ভবিষ্যতে বাণিজ্য বাড়লে বন্দরের আয়ও বাড়বে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি বাড়বে, আয়ও বাড়বে।

জনবলসংকট ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে স্বীকার করে চেয়ারম্যান বলেন, নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, স্থলবন্দরে বিনিয়োগের আগে প্রকৃত চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করা জরুরি। সব বন্দরে একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করলে অনেক স্থাপনা অব্যবহৃত থেকে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগের সুফল না মিললেও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। তাই চাহিদাভিত্তিক বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়াতে হবে।