অর্থবছর শেষ হতে বাকি মাত্র চার দিন। অথচ গত মে মাস পর্যন্ত সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) অর্ধেকের বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারেনি সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৪৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশের নিচে। এর মধ্য দিয়ে ১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে চলতি অর্থবছর। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র।
আইএমইডির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত দেড় দশকে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সাধারণত মোট এডিপির ৬৫-৭০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। অনেক বছর এ হার আরও বেশি ছিল। সেখানে এবার বাস্তবায়ন নেমে এসেছে ৫০ শতাংশের নিচে। উন্নয়ন ব্যয়ের এই মন্থর গতি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েই নয়, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে মে মাসের বাস্তবায়ন চিত্রও চলতি অর্থবছরের ধীরগতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাসে এডিপি থেকে ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই মাসে ব্যয় হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ দিকে এসেও মে মাসের বাস্তবায়ন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
আইএমইডির হিসাবে, সংশোধিত এডিপির আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মে মাস পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ১ লাখ ৭৬৪ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়। অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ মাসে এখনো প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ১৭২ কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
তুলনামূলক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ৬১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অর্থাৎ টানা কয়েক বছর ধরেই বাস্তবায়নের গতি কমছে এবং চলতি অর্থবছরে সেই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় প্রকল্পগুলোর ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ে ধীরগতি এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত গতিতে এগোতে পারেনি। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাঁচ বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। দেশের অবকাঠামো ও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশ এসব সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বাস্তবায়ন দক্ষতার প্রশ্নে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত পিছিয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, রেলপথ মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়ন হার তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এসব খাতে দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের গতি আরও মন্থর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এডিপি বাস্তবায়নের এই ধীরগতি কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সংকটেরও প্রতিফলন। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি উন্নয়ন ব্যয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় না হলে নির্মাণ খাত, পরিবহন, সেবা খাত ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।