ঠাকুরগাঁওয়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে শিশুদের সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট। নিউমোনিয়া, টাইফয়েড ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ফলে ২৫০ শয্যার ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে একটি শয্যায় একধিক শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি।
গতকাল সোমবার হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ২২২ শিশু। অথচ ওয়ার্ডটির অনুমোদিত শয্যা মাত্র ৪৫টি। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি শিশু সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় শিশু ওয়ার্ডে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৯৯ শিশু।
ওয়ার্ডটি ঘুরে দেখা যায়, জায়গার সংকটে একটি শয্যায় দুই থেকে তিন শিশুকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুকে বারান্দা ও মেঝেতে পাটি বিছিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের ভিড়ে ওয়ার্ডে গাদাগাদি পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ছয় দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে এক শিশু। শিশুটির মা ঝরনা বলেন, চিকিৎসা ও কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে পেলেও সব মেলেনি। প্রেসক্রিপশনের দরকারি কিছু ওষুধ বাধ্য হয়ে বাইরের দোকান থেকে কিনতে হচ্ছে।
শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনেরা চিকিৎসক ও নার্সের সংকটের কথাও বলছেন। আনারুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘রাতে ২২০ থেকে ২৩০ জন রোগীর সেবায় মাত্র দুইজন নার্স দায়িত্ব পালন করেন। দুইজন মানুষের পক্ষে এত শিশুর যত্ন নেওয়া অসম্ভব। দ্রুত এই ওয়ার্ডে জনবল বাড়ানো দরকার।’
তবে শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার বেগম বলেন, অমিকন, ওমিপ্রাজল, ডেক্সামেথাসন, মেরোপেনেম ও সেফট্রিয়াক্সনসহ প্রয়োজনীয় অধিকাংশ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হাসপাতালে মজুত রয়েছে।
অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সাজ্জাদ হায়দার শাহিন। তিনি বলেন, ‘ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী থাকায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে হামের মতো অতি সংক্রামক ব্যাধি যাদের আছে, তাদের আমরা আলাদা করে চিকিৎসা দিচ্ছি।’
সাজ্জাদ হায়দার শাহিন আরও বলেন, শিশুদের অতিরিক্ত ঘেমে ঠান্ডা যাতে না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ এবং এর পর সুষম গৃহজাত খাবার দিতে হবে। পাশাপাশি হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো ও ধুলাবালু থেকে দূরে রাখা জরুরি। শিশু খেতে না পারলে, বারবার বমি করলে, খিঁচুনি হলে বা অতিরিক্ত নিস্তেজ হয়ে পড়লে বিলম্ব না করে হাসপাতালে আনতে হবে।
এদিকে ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে জনবলসংকটও। হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২৫৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৭১ জন। অর্থাৎ ৮২টি পদই শূন্য।
হাসপাতালে প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের ৮৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪২টি শূন্য। নার্স ও সংশ্লিষ্ট পদে ১০১ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯১ জন। তৃতীয় শ্রেণির ৪০টি পদের মধ্যে ২০টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৭ জন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান বলেন, ‘অনুমোদিত পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফাঁকা থাকায় চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত ডিউটি পালন করে পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে। বিশেষ করে সামনে শীত বাড়লে শিশু রোগীর চাপ আরও বাড়বে। আমরা জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ হলে আমরা আরও উন্নত সেবা দিতে পারব।’