হোম > সারা দেশ > ঠাকুরগাঁও

গুদাম-ট্রাকে মজুত, তবু কৃষকের হাতে সার নেই

সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও 

খালাসের অপেক্ষায় সারবোঝাই ট্রাক। গতকাল ঠাকুরগাঁওয়ের মাদারগঞ্জ বিএডিসি সার গুদামের সামনের সড়কে। ছবি: আজকের পত্রিকা

গুদামের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ১০০ টন হলেও সেখানে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার টন সার। এর বাইরে আরও সার আছে। সেই সার রাখা হয়েছে ট্রাকেই। সার নিয়ে ৫৮টি ট্রাক দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে আছে। এই চিত্র ঠাকুরগাঁওয়ের মাদারগঞ্জের। বিএডিসি সার গুদামে এমন মজুত থাকার পরও বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।

ঠাকুরগাঁওয়ে বিএডিসির ১৪৮ এবং বিসিআইসির ৬২ জন ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ করা হয়। গুদাম কর্তৃপক্ষের দাবি মজুত সার ডিলারদের মধ্যে দ্রুত বিতরণ করে দিলে গুদামের জায়গা খালি হবে এবং বাইরে অপেক্ষমাণ ট্রাকগুলোর সারও খালাস করা সম্ভব হবে। মাদারগঞ্জ বিএডিসি সার গুদামের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মো. রাহাত জানান, গুদামের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। অক্টোবর মাসে নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ এসেছে ৯ হাজার ৫৫৯ টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে টিএসপি ২ হাজার ৯২১, এমওপি ২ হাজার ৪০ এবং ডিএপি ২ হাজার ৭ টন রয়েছে। গুদামের সামনে আরও ৫৭টি সারবোঝাই ট্রাক খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ডিলারদের মধ্যে বরাদ্দের বিভাজন না করায় ট্রাকগুলো খালাস করা যাচ্ছে না বলে গুদাম কর্তৃপক্ষের দাবি।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মাজেদুল ইসলাম বলেন, অক্টোবর মাসের বরাদ্দ ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে অগ্রিম উত্তোলনের নির্দেশনা থাকলেও ঠাকুরগাঁওয়ে তা তোলা হয়নি। তাঁর দাবি, এটি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসে অতিরিক্ত বরাদ্দ হিসেবে ২ হাজার টন টিএসপি ও ১ হাজার টন এমওপি দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের নিয়মিত বরাদ্দ ৭ থেকে ৮ অক্টোবরের দিকে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ডিলারদের কাছে আগের বরাদ্দের সার পর্যাপ্ত রয়েছে এবং তা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এমন কথা বলা হলেও ডিলারদের পক্ষ থেকেও বরাদ্দের স্বল্পতার অভিযোগ রয়েছে। সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার রাজিউর রহমান জানান, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ৪১ টন ইউরিয়া, ৭ টন টিএসপি, ১২ দশমিক ২৫ টন ডিএপি এবং সাড়ে ৭ টন এমওপি পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, মাঠের চাহিদার তুলনায় এ বরাদ্দ একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, কৃষকের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বরাদ্দ না বাড়িয়ে ডিলার বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান ডিলারদের বরাদ্দ বাড়ানোই কার্যকর সমাধান হতে পারে।

কৃষি বিভাগের সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না কৃষকদের বক্তব্যে। তাদের প্রশ্ন সার পর্যাপ্ত থাকার পরও কেন বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে সার? সদর উপজেলার নারগুন কহরপাড়া গ্রামের কৃষক মামুনুর রশীদ বলেন, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার টিএসপির বস্তা তাঁকে ১ হাজার ৫৫০ টাকায় এবং একই দামের ইউরিয়া ১ হাজার ৬০০ টাকায় খোলাবাজারে গোপনে কিনতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তারা সারের প্রয়োজন নেই বললেও আমন ধান ও শাকসবজির জন্য এ সময়ে সারের প্রয়োজন রয়েছে।

বেগুনবাড়ি এলাকার কৃষক মনসুর আলীর অভিযোগ, খোলাবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে না। পরিচিত কৃষকদের গোপনে সার দেওয়া হলেও সাধারণ কৃষকেরা তা পাচ্ছেন না। তিনি ইউরিয়ার এক বস্তার জন্য ১ হাজার ৫৫০ টাকা দিয়েছেন বলে জানান।

একই এলাকার কৃষক ইউসুফ আলীর ৩০ বিঘা জমি। তাঁর হিসাবে, আমন মৌসুমের শেষ পর্যায়ে শুধু টিএসপিই তাঁর অন্তত ছয় বস্তা প্রয়োজন। কিন্তু এনআইডি জমা দিয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র এক বস্তা। তাঁর অভিযোগ, ডিলারদের কাউকে মাসে একদিন সার দিতে আসেন, সেদিন হাজারো কৃষক লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য সার পান। তাঁর প্রশ্ন, চাহিদার তুলনায় কম সার কৃষকদের দেওয়ার পর বাকি সার কোথায় যাচ্ছে—এ বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

ঠাকুরগাঁও সুশাসনের জন্য নাগরিক কমিটির সভাপতি (সুজন) আব্দুল লতিফ বলেন, একদিকে গুদামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সার, অন্যদিকে গুদামের বাইরে সারবোঝাই ট্রাকের দীর্ঘ সারি। আবার মাঠে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাহিদার তুলনায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও জিপসামের ঘাটতি। ফলে শুধু সার আছে কি না—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে সেই সার কোথায়, কীভাবে এবং কত দামে পৌঁছাচ্ছে—এই প্রশ্নই।