• রাতারগুলে নৌকা চলাচলে রেকর্ড
• হোটেলে জায়গা না পেয়ে মাজারে রাতযাপন
• যাতায়াত ভোগান্তিতে পর্যটকদের দুর্ভোগ
• নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট প্রশাসন
শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা ছুটিতে পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলো। সবুজ টিলা, চা-বাগান, স্বচ্ছ পানির ঝরনা ও সাদা পাথরের আকর্ষণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে এসেছেন প্রকৃতির রূপকন্যা সিলেটে। এ বছর রাতারগুলে দর্শনার্থীরা রেকর্ড গড়েছেন। ইতিপূর্বে এত পর্যটক এখানে আসেননি বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে পর্যটকের ব্যাপক উপস্থিতির বিপরীতে আবাসনসংকট ও যাতায়াতের ভোগান্তি তাঁদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে মধ্যবিত্ত পর্যটকদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন ‘রাতারগুল’ এবার পর্যটকদের উপস্থিতি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য, ঈদের ছুটিতেও এত পর্যটক দেখা যায়নি।
রাতারগুলের একটি খেয়াঘাটের দায়িত্বে থাকা আল-আমীন বলেন, গত বুধবার আমার ঘাট থেকে ৩৪১টি নৌকা গেছে। অন্য দুটি ঘাট মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০টি নৌকা চলেছে। গতকাল বৃহস্পতিবারও একই রকম ভিড় ছিল। তবে আজ শুক্রবার পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
এদিকে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, জাফলং, বিছনাকান্দি, উৎমাছড়া ও লালাখালেও পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। শহরতলির চা-বাগানগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। ছবি তোলার জন্য খালি জায়গা পেতেও বেগ পেতে হয়েছে পর্যটকদের।
সাদাপাথর খেয়াঘাটের হোটেল আল বেলার মালিক লিটন মিয়া বলেন, ‘ঈদের ছুটি ছাড়া এর আগে এত পর্যটক আসতে দেখিনি। গত সপ্তাহ থেকেই পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করে। এবার ব্যবসাও ভালো হয়েছে।’
সাদাপাথর খেয়াঘাটের মাঝিমালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন জানান, গত বুধবার ঘাট থেকে প্রায় দুই হাজার নৌকা পর্যটকদের নিয়ে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭০০। আজও প্রায় ১৫০০ নৌকা চলাচল করেছে। ঘাটে নৌকা প্রায় ২০০টি হলেও প্রতিটি নৌকা দিনে ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত ট্রিপ দিয়েছে।
পর্যটকদের আগাম বুকিংয়ের কারণে সিলেট নগরী ও আশপাশের হোটেল-মোটেলগুলোতে কক্ষসংকট দেখা দিয়েছে। শেষ মুহূর্তে আসা অনেক পর্যটক জিন্দাবাজার, আম্বরখানা ও দরগাহ গেট এলাকার হোটেলগুলোতে কক্ষ পাননি। তাঁদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে রাত কাটিয়েছেন।
শাহজালাল (রহ.) মাজারে অবস্থান নেওয়া কুমিল্লার পর্যটক মামুন আহমদ বলেন, ‘পুরো শহর ঘুরেও কোনো হোটেলকক্ষ পাইনি। বাধ্য হয়ে মাজারের খোলা আঙিনায় রাত কাটাতে হচ্ছে। তবে বসার মতো জায়গা পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তিতে আছি।’
পর্যটকেরা সিলেটে বেড়াতে এলেও যাতায়াতের পথে ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কারকাজ ও কিছু সংযোগ সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লেগেছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। এ ছাড়া ট্রেনের টিকিট না পাওয়া এবং বিমানের চড়া ভাড়ার কারণেও পর্যটকদের ভোগান্তি বেড়েছে।
নগরীর দরগাহ গেট এলাকার হোটেল স্টার প্যাসিফিকের মালিক ফালা উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পর্যটকেরা সিলেটে আসতে পারছেন না। বর্তমানে হোটেলের অতিথিদের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ করপোরেট পর্যায়ের। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও পর্যটনে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তিনি।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক এজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এবার পূজায় ব্যবসা ভালো হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভালো ছিল। পর্যটকেরা সিলেটে এসে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পেরেছেন। এ নিয়ে কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি।’
সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পূজার ছুটির শেষ দিকে পর্যটকদের উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ভিজিল্যান্স দল ও পুলিশ মাঠে সক্রিয় ছিল। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। গত রাতে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে গিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখেছি।’