পালপাড়াজুড়ে ব্যস্ততা। কারও হাতে মাটি, কারও হাতে তুলি। কেউ প্রতিমার শরীরে মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন, কেউ আবার তুলির ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলছেন দেবীর চোখ-মুখ। উঠোনে সারি করে রাখা প্রতিমাগুলোর কোনোটি প্রায় প্রস্তুত, কোনোটি আবার এখনো তৈরির পর্যায়ে। দুর্গাপূজা যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কারিগরদের ব্যস্ততা। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট পালপাড়ায় এখন এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।
আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকজন কারিগর মাটি দিয়ে প্রতিমার বিভিন্ন অংশ তৈরি করছেন। কেউ বানাচ্ছেন মাথা, কেউ করছেন রঙের কাজ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ক্রেতাদের সঙ্গে চলছে প্রতিমার দরদাম।
তবে তুলনামূলক দাম বাড়েনি প্রতিমার। কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় এখানকার প্রতিমা যায়। দেশের অন্যান্য জেলা থেকেও অনেকে প্রতিমা ক্রয় করতে আসেন এখানে। তুলনামূলক কম কারুকাজের প্রতিমা কম দামে পাওয়া যায়, তাই ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান কারিগরেরা।
তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেও স্বস্তিতে নেই কারিগরেরা। তাঁদের ভাষ্য—বাঁশ, দড়ি, মাটি, রংসহ প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রতিমার দাম।
ভদ্রঘাট পালপাড়ার কারিগর জিতেন পাল প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করছেন। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখা জিতেন বলেন, ‘দড়ি, বাঁশসহ প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। কোনো কোনো জিনিসের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু প্রতিমার দাম বাড়েনি। তিন-চার বছর আগে প্রতিটি প্রতিমার সেট প্রকারভেদে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করতাম, এখনো প্রায় একই দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
প্রতিমা তৈরির পর তা পরিবহনেও ভোগান্তি পোহাতে হয় তাঁদের। বলরাম মন্দির থেকে গ্রামীণ ব্যাংক পর্যন্ত কাঁচা সড়ক থাকায় প্রতিমা নিয়ে যেতে অনেক সময় তা ভেঙে যায়। পরে আবার কারিগরদেরই মেরামত করতে হয়।
জিতেন পাল বলেন, ‘রাস্তায় প্রতিমা ভেঙে গেলে আবার আমাদেরই ঠিক করে দিতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে।’
আরেক কারিগর শ্রীকান্ত পাল বলেন, এখনো পুরোদমে বিক্রি শুরু হয়নি। তবে পূজা ঘনিয়ে এলে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিমা তৈরি করে খুব বেশি লাভ থাকে না। বাপ-দাদার পেশা, তাই ধরে রেখেছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা অবশ্য এ পেশায় আসতে চায় না।’
বগুড়া থেকে প্রতিমা কিনতে আসা সুমিত কানু বলেন, ‘এখানকার প্রতিমা দেখতে ভালো, দামও তুলনামূলক কম। আমার বাজেট ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এই টাকায় মনের মতো প্রতিমা পাওয়া যাবে কি না, দেখছি।’
কারিগরেরা জানান, ভদ্রঘাট পালপাড়ায় প্রতিবছর প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি প্রতিমা তৈরি হয়। পূজা যত এগিয়ে আসে, দিনরাত কাজ করতে হয় তাঁদের।
সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি ভিপি অমর কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘জেলায় প্রতিবছর পাঁচ শতাধিক মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়। এবারও প্রায় একই সংখ্যক মণ্ডপে পূজা হওয়ার কথা। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তার বিষয়েও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’