রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফাইন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় বিশ্বাস। এ মাসের শেষে তাঁর চতুর্থ বর্ষে ওঠার কথা। আবাসিক হলে আসন বরাদ্দের জন্য এ পর্যন্ত তিনবার আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো বরাদ্দ না পাওয়ায় মেসেই থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
শুধু হৃদয় নন, আবাসনসংকটে ভুগছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। রাবির প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৭টি আবাসিক হল এবং একটি ডরমিটরিতে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ১০ হাজারের মতো শিক্ষার্থীর। সেই হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের আবাসনসহ নানা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক বছর আগে দায়িত্ব নিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।
দীর্ঘ তিন যুগ পর গত বছরের অক্টোবরে রাকসু নির্বাচন হয়। এতে ‘১২ মাসে ২৪ সংস্কারের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। তবে রাকসুর মেয়াদ প্রায় শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যাগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। আবাসন, খাবার, পরিবহন, চিকিৎসা, একাডেমিক সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখনো ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা।
হৃদয় বিশ্বাস বলেন, ‘অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে প্রথম বর্ষেই হলে সিট পেয়ে যান, সেখানে আমি তৃতীয় বর্ষের শেষ দিকে এসেও তা পাইনি। হলে ওঠার জন্য তিনবার আবেদন করেও লাভ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। রাকসুর প্রতিনিধিরাও তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।’
তবে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট নিয়ে আমরা গত এক বছরে প্রায় প্রতিটি অধিবেশনেই কথা বলেছি। অনাবাসিক ভাতার বিষয়টি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশাসন এসব বিষয়ে খুবই উদাসীন।’
এদিকে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহারের ২ নম্বরে ছিল ‘মানসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা’। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ ব্যাপারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসাইন বলেন, ‘খাবারের মানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাঝেমধ্যে হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদের প্রতিনিধিরা পরিদর্শন করলেও উন্নতি আসেনি।’
চিকিৎসাসেবাতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটের কারণে যথাযথ সেবা পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা। যদিও মেডিকেলের অবকাঠামো উন্নয়নসহ ২৪ ঘণ্টা সেবা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রাকসু নেতারা। তাঁদের ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারকে ২০ শয্যায় উন্নীত করা। এখন ভিপি বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেবা চালু করা হঠাৎ সম্ভব নয়। এ জন্য তাঁরা প্রশাসনের কাছে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দাবি করছেন।
এদিকে পরিবহনব্যবস্থাতেও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রুটে বাসের সংখ্যা, সময়সূচি ও ধারণক্ষমতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। পরিবহনব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও কোনো অগ্রগতি নেই। একাডেমিক ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা রয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষের সংকট, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে দেরির কারণে অনেক বিভাগে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘ হচ্ছে। এদিকে, রাকসু গত এক বছরে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যা সমাধানে নজর না দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানোকে প্রাধান্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল সংগঠনের নেতাদের।
রাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যা খাবার, আবাসন, সেশনজট। এক বছরে এই সমস্যাগুলো বেড়েছে।’
রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কল্যাণে রাকসু কী কী কাজ করেছে, সেগুলো খুঁজে বের করতে আমাদের রীতিমতো চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। তারা মূলত তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মসূচি ও সেমিনার করেছে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি; বরং রাকসু প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অর্থ চুরি ও লুটপাট করা হয়েছে।’
তবে রাকসুর ভিপি দাবি করেন, ‘আমাদের ঘোষিত ইশতেহারের ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কাজ চলমান রয়েছে।’
৩৫ বছর পর নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেলেও এখন সেই আগ্রহে ভাটা পড়েছে। ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘রাকসুর বর্তমান বডি শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে। ৩৫ বছর পর রাকসুর যে তাৎপর্য, সেটাকে তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি।’