হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

মায়েদের কোল ফাঁকা, কান্না থামছেই না

রিমন রহমান, রাজশাহী

দেশের হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছেই। এতে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ। কোনো কোনো শিশুকে দিতে হচ্ছে নেবুলাইজার। চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার পরও উদ্বেগে দিন পার করছেন অভিভাবকেরা। গতকাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘হঠাৎ করেই আমার মেয়ে ছটফট শুরু করল। নার্স এসে তড়িঘড়ি করে অক্সিজেন দিল। একটা ইনজেকশন দিল। বড় একটা স্যালাইনও লাগাল। তারপরই নাক-মুখ দিয়ে রক্ত এল। মেয়ে আমার দুনিয়া থেকে চলে গেল। আমরা আর কিছুই করতে পারলাম না।’ এসব কথা বলে মোবাইল ফোনেই কাঁদতে লাগলেন চামেলী খাতুন। আর কথা বলতে পারলেন না।

চামেলী খাতুনের দুই মাসের মেয়ে নেহা আক্রান্ত হয়েছিল সংক্রামক রোগ হামে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায় সে। জরুরি প্রয়োজন থাকলেও নেহা শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) সিরিয়াল পায়নি। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সে মারা গেছে। তারপর থেকে কান্না থামছে না মা চামেলী খাতুনের। তাঁর বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার বখতারপুর গ্রামে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৮ শিশু মারা গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে নতুন আরও ২৯ শিশু ভর্তি হয়েছে। আর ছাড়পত্র পেয়েছে ২৫ জন। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে ১৩৬ শিশু। এ পর্যন্ত মোট ৫০৮ জন ভর্তি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রামেক হাসপাতালে আরও মারা গেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার টেকালা গ্রামের কৃষক সুইট রানার ৬ মাস বয়সী ছেলে শামিউল ইসলাম। গতকাল দুপুরে যোগাযোগ করা হলে সুইট রানা জানান, জুমার নামাজের পর ছেলের কবর জিয়ারত করে তিনি বাড়ি ফিরছেন। ছেলের মৃত্যুর পর থেকে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর

স্ত্রী পলি খাতুনও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাড়িতে তাঁর স্যালাইন চলছে।

ছেলে শামিউলকে হাসপাতালে ভর্তি করার ঘটনা বলতে গিয়ে রানা জানান, হামে আক্রান্ত শামিউলকে নিয়ে তাঁরা ১৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন। এর মধ্যে শেষ ৯ দিন শামিউল ছিল পিআইসিইউতে। এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসায় প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার হাসপাতালে মারা গেছে পাবনার আতাইকুলা উপজেলার চরপাড়া গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক মো. আতাউল্লাহর ১০ মাসের ছেলে জুবায়ের। গতকাল দুপুরে মো. আতাউল্লাহ জানান, হামে ছেলের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী হাজেরা খাতুন কথা বলছেন না। একদম চুপচাপ। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তাঁরা নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও পারছেন না।

মো. আতাউল্লাহ বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান আগে মারা গেছে। দ্বিতীয় সন্তানটা আছে। তার বয়স ৪ বছর। তৃতীয় সন্তানটাও ১০ মাস বয়সেই চলে গেল। যার বুকের ধন যায়, সে-ই আসল কষ্টটা বোঝে। সে তো হামের টিকা পায়নি। টিকা পেলে এ রকম না-ও হতে পারত।’

হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালে একটি হামের আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। এখানে শুধু আক্রান্ত শিশুদেরই চিকিৎসা চলছে। এই ওয়ার্ডে মায়েরা তাঁদের বুকের ধনকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন।

গতকাল সকালে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ৫ মাসের শিশু আসমাকে কোলে নিয়ে বসে রয়েছেন তার দাদি আঞ্জু বেগম। তাঁদের বাড়ি কুষ্টিয়া সদরের হরিপুর গ্রামে। হামের কারণে মুখের ভেতরেও আসমার ফোসকা পড়েছে। তাই ওষুধ দেওয়া হয়েছে। হাতে ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইন যাচ্ছে। নাকের কাছে ন্যাসাল ক্যানোলা। অক্সিজেন চলছে। আঞ্জু বেগম জানান, ৪ দিন আগে তাঁরা আসমার শরীরে হামের লক্ষণ দেখেছেন। তাই গত বুধবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

আসমার ছোট্ট শরীর দেখিয়ে মা চুমকি খাতুন বলেন, ‘হাসপাতালে আনার পর এটুকু সময়ের মধ্যে হাত-পায়ের ১০-১২ জায়গা ফুটা করা হয়েছে ক্যানোলা করতে। ভেইন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। আমার এটুকু বাচ্চা যে কী করে সহ্য করছে, আমি জানি না। আমরা এ কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।’

দুই বছরের মোহাম্মদ আলীকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন মা সুমেরা খাতুন। মোহাম্মদ আলীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। তার দাদি নাজমা বেগম জানালেন, তাঁদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বারোঘরিয়া গ্রামে। তাঁদের এলাকার অনেক বাচ্চারই হাম হয়েছে। অনেকে বাচ্চাদের পানিপড়া খাওয়াচ্ছেন। কবিরাজের তাবিজ-কবজ বাঁধছেন। কিন্তু তাঁরা হাসপাতালে এসেছেন। ১৩ দিন থেকে তাঁরা বাচ্চার জীবন বাঁচাতে লড়াই করছেন।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে আমরা সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নিশ্চিত করেছি। তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার তার সবই করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। তাঁরা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। পাশাপাশি কোন এলাকা থেকে রোগী বেশি আসছে, কোন ধরনের রোগী বেশি আসছে—এসব নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন।’

রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) দপ্তর জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভাগের হাসপাতালগুলো থেকে রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৮৬৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭৯ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এতে ১৬১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভাগের ২৭টি এলাকায় একাধিক রোগী পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় হামের সংক্রমণ হয়েছে।

বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হাম নিয়ন্ত্রণ করতে শিশুদের টিকা প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বিভাগের ৮ জেলার ১০টি উপজেলায় টিকাদান কার্যক্রম চলছে। ৬ মাস বয়স হলেই শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।’

৬ মাসের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে ৬ মাসের নিচে হামের টিকা দেওয়ার নজির আছে বলে আমার জানা নেই। এটা নিয়ে গবেষণা দরকার।’

রাজশাহীতে ভ্যানচালককে মাথা থেঁতলে হত্যা

দুই উপদেষ্টার কাছে গ্যাস চাইলেন রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা

মৃত্যুর পর রামেক পিআইসিইউতে সিট পেল নেহা, হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় তিন শিশুর মৃত্যু

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রথম দায়িত্ব: আইজিপি

রাজশাহীতে সনদ জালিয়াতি চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার

৭ দিনের মধ্যে সড়ক উন্মুক্ত করার নির্দেশ রাসিক প্রশাসকের

রাজশাহীর মনোয়ার হত্যা মামলায় হুইপ রুহুল কুদ্দুসসহ জেএমবির সব আসামি বেকসুর খালাস

বাঘায় নিখোঁজের এক দিন পর পুকুরে মিলল চা-বিক্রেতার মরদেহ

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত, স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ জোরদারের দাবি