তিন ঘণ্টার তত্ত্বীয় পরীক্ষা ফি কোনো বিভাগে ৫০, কোথাও আবার ১০০ টাকা। ব্যবহারিক পরীক্ষার ফি কোথাও ঘণ্টাপ্রতি ২০ টাকা, আবার কোথাও ১০০ টাকা। এই চিত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি)। অভিন্ন নীতিমালা না থাকায় এই বিভিন্ন বিভাগে পরীক্ষার ফরম পূরণ, মানোন্নয়ন পরীক্ষা এবং বিভিন্ন খাতে ইচ্ছেমতো আদায় করা হচ্ছে ফি। এর বাইরে বিভাগ উন্নয়ন, সমিতি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন খাতেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ রয়েছে। প্রতিবছর বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের নতুন বর্ষে ভর্তি হতে দিতে হয় ফি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিক বেতন, গ্রন্থাগার ও সেমিনার পুস্তক ক্রয়, পরিবহন, ছাত্র সংসদ, খেলাধুলা, পত্রিকা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ছাত্রছাত্রী সাহায্য তহবিল, রাবি ক্রীড়া পরিষদ, ছাত্রছাত্রী কল্যাণ তহবিলসহ বেশ কিছু বিষয়। এ ছাড়া আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হল ফি, সংসদ ফি, খেলাধুলা, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং উৎসব ফি নেওয়া হয়। তবে এসবের বাইরেও দুটি সেমিস্টারে বিভাগগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে বিভিন্ন ফি আদায় করে। কোনো নীতিমালা না থাকায় ইচ্ছেমতো ফি আদায় করে বিভাগগুলো।
বিভিন্ন অনুষদের ফরম পূরণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশ কিছু বিভাগে তিন ঘণ্টার তত্ত্বীয় পরীক্ষার জন্য ৫০ টাকা এবং তিন ঘণ্টার অধিক সময়ের পরীক্ষায় নেওয়া হয় ৬০ টাকা। আবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কিছু বিভাগে তিন ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য কোর্সপ্রতি ১০০ টাকা এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য অধিকাংশ বিভাগই ৫০ টাকা ফি নিয়ে থাকে।
কিছু বিভাগে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ঘণ্টাপ্রতি ২০ টাকা নেওয়া হয়। তবে চারুকলা অনুষদে ১০০ নম্বরের ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয় ঘণ্টাপ্রতি ১০০ টাকা। আবার কয়েকটি বিভাগে সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার ফি ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা হয়ে থাকে।
পাশাপাশি উপস্থিতির ভিত্তিতে কোনো শিক্ষার্থী নন-কলেজিয়েট হিসেবে গণ্য হলে বিশ্ববিদ্যালয় নেবে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা। কিন্তু বিবিএ অধ্যাদেশ অনুযায়ী নন-কলেজিয়েট ফি ১০০০ টাকা। আর ফাইন্যান্স বিভাগ আদায় করছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ডিস-কলেজিয়েট হলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও বিভাগটি ৪-৫ হাজার টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিচ্ছে।
ফাইন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদেরটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের এক ডিপার্টমেন্ট। সভাপতির একচেটিয়া সিদ্ধান্তই সব। তবে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম কামরুজ্জামান জানান, নন-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীরা কত টাকা ফি দেন, সেটা তিনি জানেন না। পাশাপাশি ডিস-কলেজিয়েট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।
এদিকে ব্যবসায় অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করছেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেবেন। অবৈধ কিছু হয়ে থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন।
মানোন্নয়ন পরীক্ষায় ‘লাগামহীন’ ফি: মানোন্নয়ন পরীক্ষায় বেশ কিছু বিভাগ লাগামহীন ফি আদায় করছে। বিভাগভেদে এর পরিমাণ ১০০ থেকে প্রায় ২ হাজার টাকা। সম্প্রতি ফাইন্যান্স বিভাগের প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার ফরম পূরণের বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেছে, মানোন্নয়ন পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহীদের দেড় হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি কোর্সের জন্য ১০০ টাকা দিতে হয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা বিভাগের কাছে অনেকটাই জিম্মি হয়ে আছি।’
তবে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন পরীক্ষার প্রতি নিরুৎসাহিত করার জন্য ফি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান বিভাগটির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম কামরুজ্জামান।
সার্বিক বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের প্রধান অধ্যাপক হাসনাত কবির বলেন, ‘সেমিস্টার পরীক্ষার ফি মূলত বিভাগ থেকে নির্ধারণ করা হয়। কোর্সের ধরন, প্র্যাকটিক্যাল আছে কি না, এ ধরনের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ফি নির্ধারণে ভিন্নতা থাকে।’
উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, বিষয়টি প্রশাসন খতিয়ে দেখবে।