হোম > সারা দেশ > রাজশাহী

বিশ্ব নদী দিবস: স্বরমঙ্গলা-দয়া হারাল নগরে

রিমন রহমান, রাজশাহী

রাজশাহী শহরের বর্জ্য গিয়ে মিশছে বারনই নদে। গতকাল পবা উপজেলার হড়েকগ্রামে এলাকায়। ছবি: মিলন শেখ

রাজশাহী শহরের ভেতরে একসময় তিনটি নদী ছিল। নৌকায় আনা-নেওয়া হতো পণ্য। নদীতীরেই গড়ে উঠেছিল রেশম কারখানা। চলত নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সময়ের সঙ্গে নগর বেড়েছে, বদলেছে ভূপ্রকৃতি। আর সেই পরিবর্তনের নিচে চাপা পড়েছে নদীগুলো।

শহরের ভেতর থেকে এভাবেই হারিয়ে গেছে বারাহী, স্বরমঙ্গলা ও দয়া। হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর ওপর জায়গা নিয়েছে সড়ক, স্থাপনা। তবে কিছু স্থানে নদীর পুরোনো জলপ্রবাহের পথ পুরোপুরি মুছে যায়নি। সেই পথেই এখনো পানি চলছে। কোথাও খাল হয়ে, কোথাও ড্রেন কিংবা নর্দমা হয়ে, কোথাও আবার নিচু জমির ওপর রয়েছে নদীর রেখা। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘বন নেই, নদী নেই, পানি নেই, জীবনও নেই’।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) রাজশাহী শাখার সভাপতি জামাত খান বলেন, ‘রাজশাহী শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া অন্তত তিনটি নদী হারিয়ে গেছে। আরএস ও সিএস রেকর্ডের কাগজপত্র দেখে নদীগুলো উদ্ধার করতে হবে।’

কোথায় গেল স্বরমঙ্গলা-দয়া

রাজশাহী নগরের তালাইমারী এলাকায় ছিল একটি নদীর উৎসমুখ। নদীটির নাম স্বরমঙ্গলা। একসময় এই নদী কাজলা-জামালপুর ও নামোভদ্রা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শহর পেরিয়ে পবার দিকে চলে যেত। ললিতাহার, ভালুকপুকুর ও রামচন্দ্রপুর হয়ে স্বরমঙ্গলার প্রবাহ পৌঁছাত ফলিয়ার বিলে। কিন্তু নদী হিসেবে এর অস্তিত্ব এখন আর দৃশ্যমান নয়।

নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নদীর জায়গা বদলে গেছে। শুধু স্বরমঙ্গলার নামটি টিকে থাকলেও নদীটি হারিয়ে গেছে। স্বরমঙ্গলার হারিয়ে যাওয়া প্রবাহের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল দয়া নদীর পথ। পদ্মা থেকে স্বরমঙ্গলা উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে বর্তমান রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এলাকায় পৌঁছানোর আগেই একটি শাখার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই শাখারই নাম ছিল দয়া নদী।

বর্তমান রুয়েট এলাকার ২০-২৫ গজ পূর্ব দিক থেকে দয়ার প্রবাহ শুরু হয়ে উত্তরমুখী হয়েছিল। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে নদীটি এগিয়ে যায়। প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পেরিয়ে দয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম ও উত্তর দেয়াল অতিক্রম করে রেললাইনের কাছে পৌঁছাত। রেললাইনের নিচে নদীর ওপর ছিল একটি ছোট রেলওয়ে কালভার্ট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কবরস্থানের পাশের পাকা সড়কসংলগ্ন দীর্ঘদিনের নিচু জলাভূমিটিও ছিল দয়া নদীর অংশ। মেহেরচণ্ডী কড়াইতলা পর্যন্ত একসময় নদীর আকৃতি নিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল এটি। ২০১৯ সালে রেললাইনের ওপর দিয়ে উড়ালসেতু নির্মাণের প্রকল্প নেওয়ার পর ওই জলাভূমির পুরো অংশ ভরাট হয়ে যায়। ফলে দয়া নদীর পুরোনো প্রবাহপথের দৃশ্যমান অংশটিও হারিয়ে যায়।

একসময় শহরের মেহেরচণ্ডী, খড়খড়ি, ললিতাহার, বামনশিকড়, কুখুণ্ডী, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া, সারাংপুর ও শিরোলিয়া অতিক্রম করে দয়া নদী ঘোলহাড়িয়া গ্রামে পৌঁছেছিল। সেখানে গিয়ে রাইচান নদের সঙ্গে যুক্ত হয় এর প্রবাহ। দয়া নদীর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজশাহীর পুরোনো রেশমশিল্পও। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে দয়া নদীর তীরে একাধিক ছোট রেশম কারখানা গড়ে উঠেছিল বলে পুরোনো বইপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। নদী তখন ছিল যোগাযোগের পথ, আর নদীতীর ছিল মানুষের বসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।

বারাহী এখন ড্রেন

রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর আরেকটি হলো বারাহী। এই নদীর শুরু ছিল পদ্মা থেকে। রাজশাহী নগরের ফুদকিপাড়া মহল্লার কাছে ছিল এর উৎসমুখ। পদ্মার এই শাখানদী শহরের ভেতর দিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পবা উপজেলার মহানন্দখালী গ্রামে বারনই নদে মিশেছে।

বারাহী সম্পর্কে পুরোনো লিখিত তথ্য পাওয়া যায় উইলিয়াম উইলসন হান্টারের ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব রাজশাহী’ গ্রন্থে। এতে রাজশাহীর পুরোনো জলপথের সঙ্গে এই নদীর সম্পর্কের প্রমাণ মেলে। পদ্মা থেকে বের হওয়ার পর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত এখন বারাহীর কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। মন্নুজান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি একটি স্লুইসগেটের কাছে পৌঁছাত। এরপর শহরের সাহেব বাজার বড় মসজিদকে পশ্চিম পাশে রেখে জিরো পয়েন্ট অতিক্রম করত।

আজ সেখানে নদী নেই। আছে বড় একটি ড্রেন। স্থানীয়ভাবে যার পরিচয় ‘এক নম্বর ড্রেন’। যে জলধারা একসময় পদ্মার সঙ্গে যুক্ত ছিল, শহরের কেন্দ্রভাগে এসে তার পুরোনো প্রবাহপথ এখন নগরের পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বারাহীর পথ এরপর তুলাপট্টি, রানীবাজার ও ষষ্ঠীতলার নিচ দিয়ে এগিয়েছে। নগর ভবনের গ্রিন প্লাজার নিচ দিয়েও ছিল এর প্রবাহপথ। এরপর গ্রেটার রোড অতিক্রম করে রেললাইনের পাশ দিয়ে পূর্বমুখী হয়ে গোরহাঙ্গা মোড়ের দিকে গেছে। এই অংশের বড় একটি জায়গা এখন ভরাট। স্টেশন রোড অতিক্রম করে রেলওয়ে অফিস চত্বরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশ ঘেঁষে চলত নদীটি। এরপর বিজিবি সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সের মধ্য দিয়ে বড়বনগ্রামে প্রবেশ করে। বড়বনগ্রামে গিয়ে নদীতীরের একটি মৌজার নাম পাওয়া যায় পবা গাঙপাড়া। নদী বা গাঙকে কেন্দ্র করেই এই নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

এরপর শহরের বড়বনগ্রাম, পবা উপজেলার মুশরইল, কৃষ্ণগঞ্জ, মতিয়ারবিল, সন্তোষপুর, বায়া ও সিন্দুরকুসুম্বী পেরিয়ে বারাহী পৌঁছাত মহানন্দখালী গ্রামে। সেখানে গিয়ে বারনই নদে মিশেছে এর প্রবাহ। বায়া ও কৃষ্ণগঞ্জে একসময় নদীবন্দর ছিল। এখন কিছুই নেই।

তবে পবার মুশরইল এলাকায় একটি কালভার্টের নিচ দিয়ে এখনো এর প্রবাহ বিদ্যমান। সেখান দিয়ে শহরের বর্জ্যপানি বয়ে যায়। ওই এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ফজলুর রহমান বলেন, ‘এখান দিয়েই একসময় নদী ছিল। নদীতে টলটলে পানি থাকত। ছোটবেলায় আমরা সাঁতার কেটেছি। সেই নদী দিনে দিনে মরে গেছে। নদীর ওপর মানুষের ঘরবাড়ি উঠেছে।’

বারাহীর ড্রেনে মরছে বারনই

বারাহী নদীর সেই পথের বড় একটি অংশই এখন শহরের পানি ও বর্জ্য বহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্জ্যপানির সেই প্রবাহের শেষ গন্তব্য বারনই।