• নেত্রকোনার দুর্গাপুর-কলমাকান্দা সীমান্তের অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতেন আলিফ।
• আগেও তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল, নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছিলেন তিনি।
• হত্যাকাণ্ডে শামীম ও তাজুলের দুই আত্মীয় গ্রেপ্তার, মূল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজছে পুলিশ।
• মানববন্ধনে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে কাঁদলেন আলিফের মা জোবেদা আক্তার।
কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো চায়ের দোকানি, কখনো জুতা সেলাইকারী মুচি; আবার কখনো পাগলের ছদ্মবেশে সীমান্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। উদ্দেশ্য ছিল মাদক, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের কারবার ও বালু-পাথরের ব্যবসা ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাধজগতের তথ্য সংগ্রহ করা। সংগৃহীত তথ্যের কিছু অংশ প্রকাশ করতেন নিজের ফেসবুক পেজে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকেও।
এভাবে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্তের অপরাধজগতের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি আলিফ। ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজেও বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখতেন তিনি।
আলিফের স্বজন ও সহকর্মীদের ভাষ্য, একাধিকবার আলিফকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছেও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচেনি। ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশেই গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে।
এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের তদন্তে সামনে এসেছে সীমান্ত এলাকার অপরাধজগতের দুই পরিচিত ব্যক্তি—শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ এবং তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’-এর নাম।
পুলিশ বলছে, আলিফ হত্যার ঘটনায় শুটার হিসেবে তাজুলের নাম এসেছে। শামীমকেও সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। তাঁদের দুজনের দুই আত্মীয়কে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সীমান্তের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণে শামীম ও তাজুল দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের কারবার এবং বালু-পাথরের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে শুটার শামীম ও কিলার তাজুলের নাম উল্লেখযোগ্য।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুটার শামীমের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে ৩০টির মতো এবং তাজুলের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তাজুলের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অধিকাংশই হত্যাসংক্রান্ত বলে জানিয়েছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ।
স্থানীয়ভাবে শুটার শামীম নামে পরিচিত শামীম আহমেদ দুর্গাপুর উপজেলার কাকড়াকান্দা এলাকার আবদুস ছাত্তারের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে কিলার তাজুল নামে পরিচিত তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, ডাকাতি ও সীমান্তে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
২০১২ সালে একটি অস্ত্র মামলায় আদালত তাজুলকে ১০ বছর সাত মাসের কারাদণ্ড দেন। এরপর তিনি পলাতক ছিলেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে কলমাকান্দা উপজেলা থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করে তখনকার র্যাব (বর্তমান এসআরবি)। তবে ওই সময় তাঁকে শুধু নতুন অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল এবং আগের মামলা ও সাজার তথ্য গোপন করা হয়েছিল—এমন অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় সাংবাদিক, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি গজনবী বিপ্লব বলেন, তাজুলকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর আগের মামলা ও সাজার তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে আলিফ পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন আলিফ।
আলিফের স্বজন ও সহকর্মীদের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর তখনকার পুলিশ সুপার ফয়েজ আহম্মেদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। পরে ধর্ষণসহ দুটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন আলিফ।
স্বজনদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান সাংবাদিক আলিফ। ২০২৫ সালে ওই দুটি মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
আলিফের স্বজন ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর অন্তত দুইবার আলিফকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর শহরে আলিফের মতো দেখতে পুলিশের এসআই শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর কিছুক্ষণ আগে একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন আলিফ। হামলাকারীরা তাকে ভেবে ভুল করে শফিকুলকে হত্যা করেছিল বলে ধারণা করা হয়।
এরপর গত বছরের নভেম্বরে দুর্গাপুর শহরে রামদা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আলিফের ওপর হামলা চালানো হয়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। সেবারও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
এসব ঘটনার পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নিজের নিরাপত্তাঝুঁকির কথা তুলে ধরেছিলেন সাংবাদিক আলিফ।
আলিফের কর্মস্থল রূপসী বাংলার সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আলিফ সীমান্ত এলাকার মাদক, চোরাচালান, অবৈধ বালু-পাথরের ব্যবসা, অস্ত্রের কারবার ও চাঁদাবাজির তথ্য সংগ্রহ করতেন। অনেক সময় ছদ্মবেশে এসব তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। সংগৃহীত তথ্যের কিছু অংশ নিজের পেজে প্রকাশ করার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দিতেন। আমার সঙ্গেও এসব বিষয় শেয়ার করতেন।’
আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, অপরাধের তথ্য প্রকাশের কারণে আলিফের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অপরাধী চক্রগুলো। একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার পরও তিনি কাজ বন্ধ করেননি। আলিফ পুলিশের কাছে নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়েও পাননি। তাঁকে হত্যার জন্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বসে আছে, পুলিশ সুপারকে বিষয়টি জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
সহকর্মী ও স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আলিফ হত্যার পরদিন তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৮ অক্টোবর কিলার তাজুলের ভাতিজা সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় অপূর্ব ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর হেফাজতে অস্ত্রভর্তি একটি ব্যাগ ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁকে আদালতে হাজির করে চার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গত ২০ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর থেকে আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি শুটার শামীমের ভাগ্নে। ২১ অক্টোবর তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাও বলেন, অপরাধ অনুসন্ধানের কাজ করতে গিয়ে তাঁর স্বামী সন্ত্রাসীদের বিরাগভাজন হন। একাধিকবার প্রাণঘাতী হামলার শিকার হওয়ার পরও তিনি সত্য প্রকাশের কাজ চালিয়ে গেছেন। নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, গ্রেপ্তার দুজনের একজন শুটার শামীমের ভাগনে এবং অন্যজন কিলার তাজুলের ভাতিজা। মূল শুটারদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। শুটার শামীমের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০টি এবং তাজুলের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, আলিফ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের কাছাকাছি রয়েছে পুলিশ। শুটার হিসেবে তাজুলের নাম এসেছে। শামীমকেও সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, আগের ঘটনাসহ সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে দিনরাত কাজ করছে পুলিশ।
আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নেত্রকোনা জেলা শহর ও কলমাকান্দায় মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী, স্বজন ও সাংবাদিকেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে কলমাকান্দা উপজেলার গোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামে আলিফের নিজ বাড়ি ফকিরবাড়ি মোড়ে মানববন্ধন করেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।
মানববন্ধনে আলিফের মা জোবেদা আক্তার, বড় ভাই শহীদুল ইসলাম ফকির ও সাদেক ফকির, বোন কল্পনা আক্তার ও মিলা, স্থানীয় নাজমুল হাসান, স্কুলশিক্ষক ও সাবেক ইউপি সদস্য সঞ্চয় নন্দীসহ এলাকাবাসী অংশ নেন।
মানববন্ধনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জোবেদা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’
একই দিন বেলা ১২টার দিকে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়ায় জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আরেকটি মানববন্ধন হয়। রুরাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি হায়দার জাহান চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুখলেছুর রহমান, সাংবাদিক এরশাদুল হক জনিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকেরা অংশ নেন।