ভালো ভবিষ্যতের আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন এক মা। ছেলের বিদেশযাত্রায় সর্বস্ব হারিয়ে এখন দেনার দায়ে ফ্লাস্ক হাতে রাস্তায় রাস্তায় চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া মোড়লপাড়া এলাকার বাসিন্দা পারভীন আক্তার এমন প্রতারণার শিকার।
পারভীন আক্তার জানান, ছেলেকে কিরগিজস্তান পাঠাতে তাঁর ৬ লাখ টাকা খরচ হয়। তবে বিদেশে পৌঁছানোর মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন তাঁর ছেলে মো. সোহান। বর্তমানে পাওনাদারদের চাপে তাঁর জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। টাকা উদ্ধারের জন্য আদালতে মামলা করলেও এখনো কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।
জানা গেছে, গত বছরের ৩০ এপ্রিল নগরের বাঘমারা এলাকার বাসিন্দা ও পূর্বপরিচিত ইমতিয়াজ আহম্মেদ তারেকের মাধ্যমে কিরগিজস্তান যান সোহান। ৪ লাখ টাকার চুক্তিতে বিদেশে পৌঁছানোর পর তাঁকে একটি বদ্ধঘরে আটকে রেখে দেশ থেকে আরও ২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। কোনো কাজ না দিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় তাঁকে। পরে ১২ দিন পর রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হলে ১১ মে দেশে ফিরে আসেন সোহান। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে টাকা উদ্ধারের দাবিতে গত ২৪ জুন আদালতে মামলা করেন তিনি।
পারভীন আক্তার বলেন, ‘সোহানের বাবা আমাদের সঙ্গে থাকেন না। ছেলেকে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল। তারেকের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে ৪ লাখ টাকায় বিদেশে পাঠানোর চুক্তি করি। কিন্তু বিদেশে নামার পরই ছেলেকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে আরও ২ লাখ টাকা পাঠাতে হয়। এখন মানুষের দেনার চাপে রাস্তায় চা বিক্রি করছি। ওরা আমার সংসারটা এলোমেলো করে দিয়েছে।’
ভুক্তভোগী সোহান বলেন, ‘তিন বছরের ভিসায় কিরগিজস্তানে মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতনে টেক্সটাইল কারখানায় চাকরির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয় মাত্র দুই মাসের ভিসা। বিদেশে পৌঁছানোর পর কাগজপত্র নিয়ে আমাকে একটি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। বাধ্য হয়ে আরও টাকা দিলে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। পরে দেশে ফিরে আসি।’
সোহান আরও বলেন, ‘পরে জানতে পারি, তারা আরও অনেকের সঙ্গে একই ধরনের প্রতারণা করেছে। মামলা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।’
অভিযুক্ত তারেকের বাবা এমদাদুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সোহান কোনো কাজে যোগ না দিয়েই দেশে ফিরে এসেছে। এখন তারা টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। এতে আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি।’
ময়মনসিংহ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের জনশক্তি সমীক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘সোহান বিদেশে গিয়ে দালালদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাহবুবুল হাসান আরও জানান, গত দেড় বছরে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ পেয়েছেন ১৮৩ জনের কাছ থেকে। এর মধ্যে ৩৬টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ১৭৯টি অভিযোগ তদন্তের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
সোহানের করা মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটির ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, উভয় পক্ষের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে। তবে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।