হোম > সারা দেশ > মৌলভীবাজার

আশা জাগিয়েও থমকে গেছে কলাবতী শাড়ি, সহযোগিতা চান শিল্পী রাধাবতী

মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার

কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করছেন রাধাবতী। ছবি: সংগৃহীত

কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা, সেই সুতা দিয়ে শাড়ি—ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নিয়ে ২০২৩ সালে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবী। তাঁর হাতেই তৈরি হয় কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি প্রথম আলোচিত ‘কলাবতী’ শাড়ি। তবে সম্ভাবনা জাগিয়েও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে থমকে গেছে এ শিল্পের অগ্রযাত্রা। আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আবারও কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কাজ এগিয়ে নিতে চান এই শিল্পী।

জানা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দেশের শাড়ির বাজারে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থেকে তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবী সেখানে গিয়ে শাড়িটি তৈরি করেন। শাড়িটি তৈরিতে দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হওয়ায় শিল্পীর নামের সঙ্গে মিল রেখে এর নাম দেওয়া হয় ‘কলাবতী’।

বান্দরবান জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি কলাগাছের আঁশ থেকে সুতা তৈরি করে বিভিন্ন হস্তশিল্পের পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। তবে শুরুতে এই সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল রাধাবতী দেবীরও। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধে প্রায় ১৫ দিনের চেষ্টায় তিনি একটি শাড়ি তৈরি করতে সক্ষম হন।

এরপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এই শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা স্থায়ী রূপ পায়নি। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে নিয়মিত উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও প্রশিক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় সম্ভাবনাময় এ শিল্পের অগ্রগতি থমকে যায়।

বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয় ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া, শাড়ির মসৃণতা ও আরামদায়ক বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে না পারা এবং বাজারজাতকরণের উপযোগিতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোগটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।

৯টি শাড়ি তৈরি করেছেন রাধাবতী

শিল্পী রাধাবতী দেবী জানান, এখন পর্যন্ত তিনি কলাগাছের সুতা দিয়ে মোট ৯টি শাড়ি তৈরি করেছেন। ২০২৩ সালে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে প্রথম শাড়িটি তৈরি করেন তিনি। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের আয়োজনে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে ২০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেন। সেখানে ৩০ জন নারীকে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বোনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ কার্যক্রমে চারটি শাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য তাঁকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করছেন রাধাবতী। ছবি: সংগৃহীত

একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ৬০ দিনব্যাপী আরেকটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওই কার্যক্রমেও চারটি শাড়ি তৈরি করেন তাঁরা। প্রশিক্ষণের খরচ বাদে তাঁকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল।

রাধাবতী দেবী বলেন, ‘এর পর থেকে এ বিষয়ে আর কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’

উৎপাদন খরচ বেশি, প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ

কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে রাধাবতী দেবী বলেন, একটি শাড়ি তৈরি করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। এতে খরচ হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। একটি শাড়ি তৈরিতে প্রায় ৫০০ গ্রাম কলাগাছের সুতা ছাড়াও আরও ৫০০ গ্রাম অন্য সুতা প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইলে বান্দরবান থেকে কলাগাছের সুতা নিয়ে আসতে পারব। কিন্তু শাড়ি তৈরির প্রশিক্ষণ ও অর্থের অভাব রয়েছে। শাড়ি তৈরিতে শ্রম ও খরচ দুটোই বেশি। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আমরা কাজটি চালিয়ে যেতে পারছি না। যে দুটি জায়গায় প্রশিক্ষণ দিয়েছি, সেখানে খরচ বহন করা হয়েছিল। সরকারি বা বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে অনেক ভালো হতো।’

রাধাবতী দেবীর ভাষ্য, কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প গড়ে তুলতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা প্রয়োজন। এত টাকা তাঁর পক্ষে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজ উদ্যোগে এ কাজ এগিয়ে নিতে পারছেন না। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কলাগাছের সুতা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কলাগাছ সিলেট অঞ্চলে সহজলভ্য নয়। বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা থেকে সংগ্রহ করা কলাগাছের আঁশ দিয়ে সুতা তৈরি করা হয়। বর্তমানে তিনি বিছানার চাদর তৈরি করছেন, যা দেশ ও দেশের বাইরের বাজারে বিক্রি হয়।

কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরি করছেন রাধাবতী। ছবি: সংগৃহীত

গবেষণা ছাড়া বাজারজাতকরণ কঠিন

এ বিষয়ে বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, ‘কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আমরা দুই মাসের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। তবে প্রকল্পটি সফল হয়নি। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বেশি হওয়ায় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া কাজটির ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা যাবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা উঠে আসেনি।’

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহা বলেন, ‘কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি এখনো বাজারে আসার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি। যতটুকু জানি, ওই সময় আমাদের একটি প্রতিনিধিদল বান্দরবান গিয়েছিল। শাড়িটি বাজারে আনতে হলে আরও গবেষণার প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি শাড়িতে কতটুকু কলাগাছের সুতা এবং কতটুকু অন্য সুতা ব্যবহার করা হবে, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। শাড়িটি মসৃণ ও আরামদায়ক হওয়াও জরুরি। এসব বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। শুধু বান্দরবানেই নয়, আরও অনেকে এ ধরনের শাড়ি তৈরির চেষ্টা করছেন। তাঁত বোর্ডের কাছে এ বিষয়ে কেউ সহযোগিতা চাইলে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।’