হোম > সারা দেশ > কুষ্টিয়া

আবরার হত্যার ৭ বছর: রায় কার্যকরের অপেক্ষায় পরিবার

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

ছেলের ছবির সামনে নিয়ে বসা মো. বরকত উল্লাহ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হলো আজ। বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্ট—দুই ধাপেই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকলেও চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। আপিল বিভাগে আসামিদের আবেদনের শুনানি ও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আটকে আছে বহুল আলোচিত এ মামলার রায় কার্যকর। দীর্ঘ এই সময়ে একের পর এক আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায় এলেও আবরারের পরিবারের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না।

আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বলেন, তাঁর ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং গোটা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ পতনের দীর্ঘ আন্দোলনের অন্যতম সূচনা হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যার মধ্য দিয়ে। অথচ যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে দেশে পরিবর্তন এলো, সেই হত্যার চূড়ান্ত বিচারই এখনও ঝুলে আছে।’

ফাইয়াজ জানান, ২০২৫ সালের মার্চে হাইকোর্টের রায়ের পরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় মামলাটি তালিকা (সিরিয়াল) অনুযায়ী এগোচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার সিরিয়াল চাইলে এগিয়ে আনা সম্ভব। সেখানে কেন দ্বিধাবোধ করা হচ্ছে? রায় কার্যকরের চূড়ান্ত পদক্ষেপে এই কালক্ষেপণ অবহেলা ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা কমিটির সদস্য সচিব সুলতান মাহমুদ তালহা এ বিষয়ে বলেন, আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করা শুধু তাঁর পরিবারের নয়, দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দাবি। এই হত্যাকাণ্ডের রায় বাস্তবায়নে কোনো শিথিলতা গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ছেলের হত্যাকারীদের চূড়ান্ত শাস্তি না দেখতে পারার আক্ষেপ নিয়ে আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘সরকার পরিবর্তন হলেও আবরার হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়ে গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়তে গিয়ে ছেলেটা এভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো। বছরের পর বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা এখনও বিচারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখতে পেলাম না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, আপিল বিভাগের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর করা হোক।’

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে একটি বিশ্লেষণাত্মক পোস্ট দেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। এর পরদিন ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের একদল নেতাকর্মী তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। পরদিন হলের সিঁড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দেশজুড়ে তীব্র ছাত্রবিক্ষোভের মুখে আবরারের বাবা বাদী হয়ে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন।

তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় পুরোপুরি বহাল রাখেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করায় মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পথ এখনও সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।